বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ (এনপিএল) এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ১৮ মাস মেয়াদি একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘদিনের সংকট থেকে বের করে আনার একটি বড় পরীক্ষা। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই পরিকল্পনা কি সত্যিই পরিবর্তন আনবে, নাকি অতীতের মতো আরেকটি সাময়িক সমাধান হয়েই থাকবে?
১৮ মাসের রোডম্যাপে কী রয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন পরিকল্পনায় রয়েছে কঠোর তদারকি, সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পুনর্গঠন, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার, আইনি সংস্কার, ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন এবং নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা আইনের বাস্তবায়ন।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এককালীন নিষ্পত্তি সুবিধা। এই ব্যবস্থায় কিছু ঋণগ্রহীতা মূল ঋণের অর্থ পরিশোধ করলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সুদ সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফের সুযোগ পেতে পারেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এতে দীর্ঘদিনের অচল ঋণ আদায় সহজ হবে এবং অনেক ব্যবসা আবারও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে পারবে।
কেন এত বড় সংকট তৈরি হলো?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল তদারকির কারণে এই সংকট গভীর হয়েছে।
গত এক দশকে খেলাপি ঋণ কমানোর নামে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং বিভিন্ন ধরনের পুনর্গঠন কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগে প্রকৃত সমস্যা দূর হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে গেছে।
বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর সঙ্গে অবলোপন করা ঋণের হিসাব যোগ করলে প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সুদ মওকুফ—সমাধান নাকি নতুন ঝুঁকি?
নতুন পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো জমে থাকা সুদ মওকুফের সুযোগ।
এর পক্ষে যুক্তি হলো, সব খেলাপি ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেননি। অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য বাস্তবসম্মত একটি পুনরুদ্ধার সুযোগ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, ব্যাংক মূলত জনগণের আমানতের অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। সুদের বড় অংশ মওকুফ করা হলে সেই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে—ব্যাংকের শেয়ারধারী, আমানতকারী নাকি সরকার?
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পরে সরকারি অর্থ দিয়ে পুনঃমূলধনীকরণ করতে হলে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশও অতীতে একই ধরনের ব্যাংকিং সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
এশীয় আর্থিক সংকটের পর দক্ষিণ কোরিয়া সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠন করে। তারা খেলাপি ঋণ কিনে পুনর্গঠন করে এবং ধীরে ধীরে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
মালয়েশিয়াও একই ধরনের একটি মডেল অনুসরণ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। অপরদিকে চীনের কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল সম্পদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
তবে সব দেশ সমান সফল হয়নি। ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘ আইনি জটিলতার কারণে একই ধরনের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই হবে না; সেটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে পরিচালনার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
নতুন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকও একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাজ করবে।
তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর। যদি রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠানও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজর
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও সংস্কারের সঙ্গে তাদের সহায়তার বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ সংস্কারের গতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দেশের নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। শুধু খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান কমিয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা, যেগুলোর কারণে বছরের পর বছর এই সংকট তৈরি হয়েছে।
যদি প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা যায়, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি বাড়ে, তাহলে বর্তমান ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, অতীতের মতো যদি রাজনৈতিক বিবেচনা আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে এই উদ্যোগও আগের অনেক পরিকল্পনার মতো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কেবল খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি আমানতকারীর সঞ্চয়ের নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
আগামী ১৮ মাসে খেলাপি ঋণের সংখ্যা কতটা কমে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও বড় বিষয় হবে—এই সংকটের মূল কারণগুলো দূর করে বাংলাদেশ কি একটি আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে কি না।

