বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘ ও অদক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খলকে চিহ্নিত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদক থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পথে কিছু খাদ্যপণ্যের দাম সর্বোচ্চ ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবার।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এতে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফকরুদ্দিন আল কবির।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য কিনতে ব্যয় হয়।
তিনি বলেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু একটি কারণ কাজ করে না। উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, বিপণন ব্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরবরাহ সংকট, মজুতদারি এবং বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতাসহ একাধিক বিষয় একসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদক ও খুচরা বাজারের মধ্যে কাঁচা মরিচের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, যার ব্যবধান ১১৬ শতাংশ। এছাড়া মাঝারি মানের চালে প্রায় ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ দামের ব্যবধান পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে ছোট সরবরাহ শৃঙ্খল থাকা পণ্যে এই ব্যবধান অনেক কম। ডিমে ২৫ শতাংশ, মুরগির মাংসে ২২ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, যেসব পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে বেশি ধাপ অতিক্রম করে, সেগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি বেড়ে যায়। তাই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ ও সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিভাগের ১০টি বাজারের ৮২০ জন ব্যবসায়ীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এতে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত শহরের আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বাজারে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে, প্রতিযোগিতা কমছে এবং দামের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
মাঝারি মানের চালের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের মাত্র ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পান কৃষক। বিপরীতে, অটো রাইস মিল মালিকরা সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করেন এবং চালের মজুত, সরবরাহ ও দাম নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখেন।
ফকরুদ্দিন আল কবির বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু উৎপাদন ব্যয় দায়ী নয়। সরবরাহ ঘাটতি, বাজারে কিছু প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণও সমানভাবে ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে, সঞ্চয় ভাঙছে কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকে খাদ্যের অংশ ৫৯ শতাংশ। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের মোট ভোগ ব্যয়ের প্রায় ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় হলেও সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের কারণ হিসেবে সরবরাহ ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ, অন্যায্য মজুতদারি, পর্যাপ্ত হিমাগার ও কোল্ড-চেইনের অভাব, ফসল সংরক্ষণে দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি বা কিছু প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকলেই সেটিকে অবৈধ সিন্ডিকেটের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
পরিস্থিতি উন্নয়নে সিপিডি খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কোল্ড-চেইন ও হিমাগার সম্প্রসারণ, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি বাজারসংযোগ গড়ে তোলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং প্রমাণিত মজুতদারি ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

