বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে, তবে এখনো বেশ কিছু গভীর কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছর ২০২৬-এর এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এমন চিত্র তুলে ধরেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
শীর্ষস্থানীয় এই ব্যবসায়ী সংগঠনের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে ফিরতে পারেনি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি এখনো দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
এমসিসিআইয়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর ২০২৬-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। আগের অর্থবছর ২০২৫-এ এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ব্যয় বেড়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপও কমেনি।
বৈদেশিক খাতে স্বস্তি, তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ
অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো বৈদেশিক খাতের কিছুটা শক্তিশালী অবস্থান। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে।
এমসিসিআই জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ২০২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এখনো বেশ কিছু বাধা রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি চাপের মধ্যে রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতও এখনো নানা সমস্যার মুখোমুখি। পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে চাপ।
এমসিসিআই বলেছে, সামগ্রিকভাবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকটি ছিল অর্থনৈতিক সমন্বয় প্রক্রিয়া থেকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের দিকে যাওয়ার একটি সময়। তবে এই পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
শিল্প খাতে দুর্বলতা বিনিয়োগের সংকেত দিচ্ছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) শিল্প খাতে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকোচন দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকায়, ঋণের উচ্চ খরচ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প খাত প্রত্যাশিত গতি পায়নি।
এর মধ্যে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল ছিল। একই সময়ে উৎপাদন উপখাতে প্রবৃদ্ধি কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও উদ্যোক্তাদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরেনি।
রপ্তানি বাড়ছে না প্রত্যাশিত গতিতে
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। আগের বছরের জুনে এই আয় ছিল ৩ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে পুরো অর্থবছরের হিসাবে রপ্তানি আয় প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৬ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। সরকারের নির্ধারিত ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি প্রায় ১২ শতাংশ কম।
এমসিসিআই বলছে, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ রপ্তানি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ কমছে কেন?
বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে এমসিসিআই জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশে শ্রম ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটি আকর্ষণীয় হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে আসছে না।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে এমসিসিআই। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল অবকাঠামো, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, শিল্প জমির ঘাটতি, দুর্নীতি এবং নিয়মকানুন প্রয়োগে অসামঞ্জস্য।
সংগঠনটি মনে করছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এসব বাধা দূর করতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু স্থানীয় বিনিয়োগ নয়, বিদেশি বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামনে অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা
এমসিসিআইয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সময়ে রপ্তানি, আমদানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে পারে। তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর অর্থ পরিশোধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা কমতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়েও কিছুটা আশার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ধারণা, আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও ২০২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে তা কমে আসতে পারে। আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচকের বৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে এখনো মিশ্র প্রবণতা রয়েছে।
এমসিসিআই মনে করছে, সামনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে এখন প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি পরিবর্তনের সময় পার করছে। বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের জন্য এখনো বড় ধরনের সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

