তীব্র দাবদাহ এখন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নয়, এটি বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করেছে। প্রতিদিনের কাজ চালিয়ে যেতে স্যালাইন, ডাব, লেবুর শরবত, ঠান্ডা পানীয় ও ওষুধের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে হাজারো শ্রমিককে। বিশেষজ্ঞরা এই বাড়তি ব্যয়কে ‘অদৃশ্য তাপ কর’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা শ্রমিকদের সীমিত আয়ের ওপর নীরব চাপ তৈরি করছে।
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ৩২ বছর বয়সী নাসরিন বেগম জানান, মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনের মধ্যেও শুধু গরমে সুস্থ থাকার জন্য তাঁকে প্রতি মাসে এক হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হয়। স্যালাইন, লেবু ও ডাব ছাড়া দীর্ঘ সময় কারখানায় কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারখানায় ফ্যান চালু থাকলেও প্রচণ্ড গরম থেকে পুরোপুরি স্বস্তি মেলে না। তাই কাজের ফাঁকে বারবার পানি দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখতে হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বড় একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহের প্রভাব মোকাবিলায় নিজেদের পকেট থেকেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন। শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সংস্থার গবেষকদের মতে, এই ব্যয় কোনো বেতন কাঠামোতে বিবেচনায় আসে না, কিন্তু বাস্তবে এটি শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা আরও ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। ফলে কারখানার ভেতরে দীর্ঘ সময় কাজ করা আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালে দেশের অনেক পোশাক কারখানার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। অথচ শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য দাবদাহ মোকাবিলায় এখনো কোনো সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা নেই। ফলে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
নারী ও গর্ভবতী শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। নাসরিন বেগম জানান, গর্ভাবস্থায় প্রচণ্ড গরমের কারণে তাঁকে কয়েকবার অর্ধদিবস ছুটি নিতে হয়েছিল। এতে প্রতিবার তাঁর মজুরি থেকে প্রায় ১০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনই অনেক সময় আয়ের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দাবদাহের প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারখানা মালিকদেরও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। অনেক কারখানায় অতিরিক্ত ফ্যান, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বিনা মূল্যে স্যালাইন সরবরাহ এবং হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালানোর কারণে পরিচালন ব্যয় ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তবুও শ্রমিকদের ব্যক্তিগত খরচ কমছে না। অনেকের দাবি, গরমে সুস্থ থাকতে মাসে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। আখের রস, ঠান্ডা পানীয়, স্যালাইন ও ওষুধ কেনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তিও তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আর শুধু মানবিক বিষয় নয়, এটি দেশের শিল্পখাতের টেকসই উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং শ্রমিকবান্ধব নীতিমালা ছাড়া ভবিষ্যতে এই অদৃশ্য ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে দাবদাহের প্রভাব সামাল দিতে সরকার, শিল্পমালিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

