ব্রিকস কি? ব্রিকস (BRICS) হলো বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট। এর মূল সদস্য দেশগুলো হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া এবং সৌদি আরব যুক্ত হয়। ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলনের পর ব্রিকস বড় হতে শুরু করে। ২০২৪ সালের কাজান সম্মেলনে আরও কিছু দেশ অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যও না, অংশীদার দেশও না। ২০২৪ সালের প্রথম সম্প্রসারণেও ছিল না, কাজান সম্মেলনের পরের তালিকাতেও নেই।
তবে নয়াদিল্লির ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে (১২-১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) ভারত বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে ডেকেছে। কিন্তু এই আমন্ত্রণে কোনো সদস্যপদের অধিকার বা বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশের সাথে ব্রিকসের আসল আইনি সম্পর্ক এখনো মূলত এনডিবির শেয়ারহোল্ডিং পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।
এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। কারণ দেশে যে ‘সুবিধা-অসুবিধা’ নিয়ে আলোচনা হয়, তার অনেকটাই এমন একটা সদস্যপদ ধরে নিয়ে হয় যেটা এখনো ঘটেইনি। ভোটাধিকার কত হবে, কত টাকা দিতে হবে, বিরোধ হলে কী হবে এসব কিছুই এখনো ঠিক হয়নি। তাই যেকোনো বিশ্লেষণকেই একটু শর্তসাপেক্ষ ধরে নিতে হবে।
যোগ দিলে কী কী সুবিধা পাবে বাংলাদেশ
উন্নয়ন-অর্থায়নের নতুন পথ
এনডিবির সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বব্যাংকের বাইরে একটা বিকল্প পেয়েছে, যা হলো নিজস্ব নিয়মে ঋণ, নিজস্ব শর্তে বিতরণ। সম্পর্ক আরও গভীর হলে সহজ শর্তে, স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। এটা বিশেষভাবে জরুরি, কারণ এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে অনেক সুবিধাই হাতছাড়া হয়ে যাবে।
স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন
ব্রিকস দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করার দিকে ঝুঁকছে। এতে ডলার-সংকটের মতো পরিস্থিতি, যেমনটা ২০২২-২৩ সালে দেখা গিয়েছিল, তার ধাক্কা কিছুটা কম লাগতে পারে। তবে এই ব্যবস্থাটা আইএমএফের নিয়মের সাথে না মিললে সমস্যা হবে। কিন্ত ডলার কেন্দ্রিকতা থেকে বের হতে এইটা ভালো সুযোগ।
পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ বলছে সবার সাথে সমান সম্মানের সম্পর্ক রাখতে হবে, কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বিদ্বেষ নয়’ এই নীতিটাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ইইউর সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখেই ব্রিকসের সাথেও সম্পর্ক রাখা যায়, যতক্ষণ না কোনো একচেটিয়া প্রতিশ্রুতি দিতে হচ্ছে। কিন্ত ব্রিকস আমেরিকান স্বার্থ একসাথে রক্ষা করা কতটা কঠিন হবে তা ভবিষ্যত বলবে।
বাণিজ্য-বিনিয়োগে বৈচিত্র্য
সম্পর্ক গভীর হলে নতুন বিনিয়োগ চুক্তি বা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের এমনিতেই প্রায় ৩০টা দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি আছে—নতুনগুলো সেগুলোর পরিপূরক হতে পারে, প্রতিস্থাপক নয়।
যোগ দেয়ার অসুবিধাসমূহ
ডব্লিউটিওর নিয়ম
বাংলাদেশ ১৯৯৫ থেকে ডব্লিউটিওর সদস্য। গ্যাটের ১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব সদস্য দেশকে সমান সুবিধা দিতে হয়—কাউকে আলাদাভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না, নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। ব্রিকসের মধ্যে যদি কখনো আলাদা শুল্ক-সুবিধা তৈরি হয়, সেটা এই নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ভালো খবর হলো, এখনো ব্রিকসের ভেতরে কোনো মুক্ত বাণিজ্য এলাকা বা শুল্ক-ছাড়ের ব্যবস্থা নেই। তাই এই ঝুঁকিটা এখনো তাত্ত্বিক, বাস্তব নয়। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি ব্রিকস মুদ্রা-ব্যবস্থা থেকে শুল্ক-সুবিধার দিকে এগোয়, তখন এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
রাশিয়া ব্রিকসের সদস্য, আর রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা অনেক ব্যাপক। ব্রিকসের কোনো পেমেন্ট বা বিনিয়োগ ব্যবস্থায় ঢুকলে বাংলাদেশি ব্যাংক আর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পরোক্ষ ঝুঁকি চলে আসতে পারে। তার উপর বাংলাদেশের ৮০% গার্মেন্টস এর ক্রেতা আমেরিকান বাজার, সেই ক্ষেত্রে এক্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রি বিরাট ক্ষতির মুখে পরবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ আইন (যেমন ক্যাটসা) বিদেশি ব্যাংকগুলোকেও টার্গেট করতে পারে, যদি তারা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রুশ প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো মার্কিন ডলার-নির্ভর করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাই এখানে সাবধানতা জরুরি।
আইএমএফের শর্ত
বাংলাদেশ আইএমএফ চুক্তির অনুচ্ছেদ VIII মেনে চলতে বাধ্য। মানে চলতি লেনদেনে বিধিনিষেধ দেওয়া যাবে না, আর মুদ্রা-ব্যবস্থায় বৈষম্য করা যাবে না। ব্রিকসের কোনো স্থানীয়-মুদ্রা বা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় যোগ দিলে সেটা এই নিয়মের সাথে না মিললে সমস্যা হবে।
এটা একটা কারিগরি বিষয়, কেস-বাই-কেস আইএমএফের সাথে বসে ঠিক করতে হবে। বিশেষ করে এখন যেহেতু বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি চলমান, এই জায়গাটায় বাড়তি সতর্কতা দরকার।
জিএসপি আর পশ্চিমা বাণিজ্য সুবিধা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সুবিধা বাংলাদেশ এখনো পাচ্ছে, আর এলডিসি থেকে বের হওয়ার আগে জিএসপি+ পাওয়ার চেষ্টাও চলছে। এই সুবিধাগুলোর সাথে সাধারণত সুশাসন আর মানবাধিকার সংক্রান্ত শর্ত জুড়ে দেওয়া থাকে।
আইনি দিক থেকে ব্রিকসে যুক্ত থাকলে এসব সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে, এমন সরাসরি কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বা আন্তর্জাতিক আইনি ঝামেলায় জড়ানো দেশগুলোর সাথে বেশি ঘনিষ্ঠতা কূটনৈতিকভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপের চোখে।
বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশ যদি সদস্য পদ নিতে চায় সেক্ষেত্রে আইনি সামঞ্জস্য যাচাই করে আগে একটা আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা দরকার — এই তিনটা জায়গায়:
- ডব্লিউটিও — কোনো অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক-ব্যবস্থা তৈরি হলে সেটা গ্যাটের ১ অনুচ্ছেদ (এমএফএন নীতি) ভাঙছে কিনা।
- আইএমএফ — কোনো বিকল্প মুদ্রা-ব্যবস্থায় ঢুকলে সেটা অনুচ্ছেদ VIII-এর শর্ত ভাঙছে কিনা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি চলমান, তাই এখানে বাড়তি সতর্কতা দরকার।
- এফএটিএফ — কোনো পেমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হলে অর্থ পাচার-বিরোধী মানদণ্ডের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কিনা।
ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা যাচায়
রাশিয়া ব্রিকসের সদস্য। যেকোনো ব্রিকস-সংযুক্ত লেনদেন ব্যবস্থায় ঢুকলে সেকেন্ডারি স্যাংশনের ঝুঁকি চলে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত আগে থেকেই একটা সঙ্গতি-কাঠামো (compliance framework) তৈরি রাখা — যাতে ভুলবশত নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন না হয়ে যায়।
পশ্চিমা বাণিজ্য সুবিধা হাতছাড়া না করা
ইইউর “এভরিথিং বাট আর্মস” আর জিএসপি+-এর মতো সুবিধাগুলো বাংলাদেশের জন্য এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত এলডিসি উত্তরণের সময়টায়।
আইনগতভাবে ব্রিকসে থাকলে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। কিন্তু কূটনৈতিক বার্তা যেন এমন না হয় যে বাংলাদেশ একদিকে ঝুঁকে পড়ছে। দুই দিকই ধরে রাখার কূটনীতিটা চালিয়ে যাওয়া দরকার।
এনডিবির মাধ্যমেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া
পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াই বাংলাদেশ এনডিবির মাধ্যমে ব্রিকসের সাথে বাস্তব ও লাভজনক সম্পর্ক রাখতে পারছে। এই সম্পর্কটা আরও গভীর করা যায়, ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে, প্রকল্প বাড়িয়ে।
- জয়দীপ ঘোষ এলিন: লিগ্যাল রিসার্চার; সিটিজেন্স ভয়েস

