বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে চীনের উপস্থিতি গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। একসময় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প—সড়ক, সেতু, টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিচিত ছিল। তবে এখন তাদের ভূমিকা বদলাচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চীন বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন, উৎপাদন খাত ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা FDI-এর পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নিট FDI-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ছিল চীন। মোট বিদেশি বিনিয়োগের ১৮ শতাংশের বেশি এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আসা প্রায় প্রতি পাঁচটি বিনিয়োগ ডলারের মধ্যে একটি এসেছে চীন থেকে।
গত বছর চীনের বিনিয়োগ ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং দেশটির বাংলাদেশে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যায়।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে বিদ্যুৎ খাতে। এই খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ডলার এবং তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, রাসায়নিক, ওষুধ, কৃষি, চামড়া ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে চীনা কোম্পানির পরিচিতি ছিল মূলত ঠিকাদার হিসেবে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে তাদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু প্রকল্প নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে চাইছে।
চীনের এই নতুন কৌশলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (China Economic and Industrial Zone—CEIZ)।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন এটি তেমন অগ্রগতি পায়নি। সম্প্রতি নতুন করে প্রকল্পটির কাজ গতি পেয়েছে।
এই শিল্প অঞ্চলে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে এটি এক লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, CEIZ শুধু আরেকটি শিল্প প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন ধাপের প্রতীক। কারণ এর মাধ্যমে চীন বাংলাদেশে শুধু অবকাঠামো তৈরি করবে না, বরং সরাসরি উৎপাদন শিল্প গড়ে তুলবে।
চীনা বিনিয়োগ এখন শুধু চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় ঢাকা ও বেইজিং মংলা বন্দরে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে একটি চুক্তি করেছে।
এর পাশাপাশি বন্দর অবকাঠামো, লজিস্টিকস এবং শিল্প উন্নয়নেও চীনের আগ্রহ বাড়ছে। যদিও অনেক প্রকল্প এখনো পরিকল্পনা বা সমঝোতা পর্যায়ে রয়েছে, তবে এগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীন বাংলাদেশে আলাদা আলাদা প্রকল্পের চেয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। চীনে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান বিদেশে উৎপাদন স্থানান্তরের পথ খুঁজছে।
গত এক দশকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া এই বিনিয়োগের বড় অংশ পেয়েছে। এখন বাংলাদেশও “China Plus One” কৌশলের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে।
বাংলাদেশের রয়েছে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, দক্ষ তৈরি পোশাক খাত, বড় শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য সুবিধা। এসব কারণে চীনা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
জ্বালানি খাতেও চীনের আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) অবকাঠামোতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সুযোগ খুঁজছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাংলাদেশের তৃতীয় ভাসমান LNG টার্মিনাল (FSRU) নির্মাণের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া টেক্সটাইল, পোশাক, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক, রাসায়নিক, ব্যাটারি ও অন্যান্য উৎপাদন খাতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫১০টি চীনা প্রতিষ্ঠান উৎপাদন, বিদ্যুৎ, নির্মাণ, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক এবং অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস। ফলে চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করেছে।
তার মতে, চীনের উচ্চমূল্যের শিল্পে যাওয়ার প্রবণতা এবং শ্রমনির্ভর শিল্প অন্য দেশে স্থানান্তরের কারণে বাংলাদেশ নতুন সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, আনোয়ারার চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এটি নতুন কারখানা আকর্ষণের পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী বন্দরের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আগে যেখানে চীনের ভূমিকা ছিল মূলত অবকাঠামো নির্মাণে, এখন সেখানে উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি শিল্পে অংশীদার হওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ চীনা বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ পেতে পারে।
তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, চীনের অর্থনৈতিক পদচিহ্ন বাংলাদেশে আরও গভীর হচ্ছে। আগামী দিনে এই সম্পর্ক শুধু অবকাঠামো সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শিল্পায়ন ও বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

