বিদেশি ঋণ পরিশোধে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ; প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে তলানিতে।
গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন সময়ে দাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদ-আসল বাবদ ৪৪৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। এই অঙ্ক আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল।
তবে গত অর্থবছরে বিভিন্ন দাতাদেশ ও সংস্থা ৫২৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ কম। আর এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৩২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রতিশ্রুতির অঙ্ক ছিল ৫২৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলার।
অর্থবছর শেষ হওয়ার এক মাস পর রোববার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের ঋণের প্রতিশ্রুতি, প্রাপ্তি ও পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাতে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ৮০৭ কোটি ৩১ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। যা আগের আর্থিক বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ কম।
২০২৪-২৪ অর্থবছরের উন্নয়ান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ৮৫৬ কোটি ৮৪ লাখ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আগের ঋণের সুদ-আসল বাবদ যে ৪৪৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে, তার মধ্যে ২৯৫ কোটি ৯৫ লাখ ডলার শোধ করা হয়েছে আসল বাবদ। আর সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৫৪ কোটি ডলার।
টাকার হিসাবে ইআরডি বিদেশি ঋণ পরিশোধের যে হিসাব দিয়েছে তাতে দেখা যায়, গত অর্থবছরে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।
১৪ বছরে পরিশোধ বেড়েছে চার গুণ
বড় বড় প্রকল্পের বিদেশি ঋণ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন কয়েক বছর ধরেই।
ইআরডি থেকে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সব মিলিয়ে ১১০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। পরের ১০ বছরে অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ২০১ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২৭৫ কোটি ডলারে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিশোধ করেছিল ৩৩৭ কোটি ডলার।
২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে পরিশোধ করা হয় ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে করা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার।
এ হিসাবে দেখা যায়, ১৪ বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ চার গুণের বেশি বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঋণ বিশ্ব ব্যাংকের
ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ৮০৭ কোটি ৩১ লাখ যে ঋণ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার বিশ্ব ব্যাংক দিয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯১ কোটি ডলার দিয়েছে ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ১০৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার দিয়েছে রাশিয়া। জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দিয়েছে ৭৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার।
অন্য দাতা দেশ ও সংস্থার মধ্যে ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে চীনের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৫৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার। ভারত দিয়েছে ২৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) দিয়েছে ৬৯ কোটি ৩১ লাখ ডলার।
ভারত ও রাশিয়া কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি
ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও রাশিয়া নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে। এই আর্থিক বছরে সবচেয়ে বেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। বিশ্ব ব্যাংক দিয়েছে ৮২ কোটি ডলার।
এছাড়া জাপান ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, এআইআইবি ২৫ কোটি ডলার এবং চীন ২৮ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চলতি অর্থবছরের চিত্র
পরিসংখ্যান যখন প্রতিকূল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় অংকের বিদেশি ঋণের ওপর ভর করে ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এর ওপর ভিত্তি করেই চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে বিএনপি সরকার।
চলতি অর্থবছরে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করতে গিয়ে নিট বিদেশি ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে গত অর্থবছরে পাওয়া নিট বিদেশি ঋণের প্রায় দ্বিগুণ।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বিদেশ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্য ধরেছে, যা জিডিপির ২ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থাৎ সংকটের এই সময়ে বাজেটের মোট ঘাটতির ৬৪ দশমিক ১৩ শতাংশই বিদেশি ঋণ দিয়ে পূরণের লক্ষ্য ধরেছে সরকার।
এর মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে আগে নেওয়া ঋণের কিস্তি আর সুদ পরিশোধে। তাতে নিট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা গেল অর্থবছরের সংশোধিত নিট বিদেশি ঋণের চেয়ে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা কমে ৯৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আর কিস্তি ও সুদ মিলিয়ে (সুদ-আসল) নিট বিদেশি ঋণ ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থনীতিতে শুরু হওয়া ‘অস্থিরতা’ না কাটায় গত দেড় বছরে উন্নয়ন কার্যক্রমে খুব একটা গতি আসেনি। এ কারণে বিদেশি ঋণের অর্থছাড়েরও গতি কম।

