দেশকে নগদ অর্থনির্ভর অর্থনীতি থেকে আরও বেশি ডিজিটাল লেনদেনের দিকে নিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগের অন্যতম হলো বাংলা কিউআর, যার মাধ্যমে একটি কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব। তবে বাধ্যতামূলক করার পরও এই ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না। ব্যবসায়ী, গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মাশুল, হিসাব খোলার জটিলতা, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাসহ একাধিক কারণে বাংলা কিউআর এখনো সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেনের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি।
রাজধানীর বনশ্রী এলাকার মুদিদোকানি আল-আমীনের মতো অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, তাদের দোকানে এখনো বাংলা কিউআর পৌঁছায়নি। অনেক ক্রেতাও এই পদ্ধতিতে অর্থ পরিশোধে আগ্রহ দেখান না। ফলে বাধ্যতামূলক নীতির বাস্তব প্রভাব মাঠপর্যায়ে এখনো খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো বাংলা কিউআর ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করলে বিক্রেতাকে ১ শতাংশ মাশুল দিতে হয়। অর্থাৎ, এক হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করলে ব্যবসায়ীর হাতে আসে ৯৯০ টাকা। অঙ্কে খুব বেশি না মনে হলেও ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলছেন, যেসব ব্যবসায়ী প্রতিদিন অল্প লাভে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের জন্য এই মাশুল একটি বড় চাপ। ফলে অনেকেই ডিজিটাল লেনদেনের পরিবর্তে নগদ অর্থ গ্রহণকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যাংকের কার্ড ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ দেশের মোট ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় বাংলা কিউআরের অংশ এখনো খুবই সীমিত।
ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এর তুলনায় বাংলা কিউআরের বিস্তার এখনো খুবই কম।
অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন, নতুন এই ব্যবস্থার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। কীভাবে অর্থ গ্রহণ করতে হবে, কত সময়ে টাকা হিসাবের মধ্যে জমা হবে কিংবা কী ধরনের খরচ রয়েছে—এসব বিষয় সম্পর্কে অনেকেই স্পষ্ট ধারণা পাননি।
ডিজিটাল লেনদেনের জন্য স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে মাত্র ৫৭ শতাংশ মানুষের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠী বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ থেকেও বাইরে রয়ে গেছে।
অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বাসায় ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও বাইরে কেনাকাটার জন্য আলাদা মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। অতিরিক্ত এই ব্যয়ও অনেককে কিউআরভিত্তিক লেনদেন থেকে দূরে রাখছে।
ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশ কিউআরভিত্তিক অর্থ পরিশোধ জনপ্রিয় করতে খুব কম বা শূন্য মাশুলের নীতি অনুসরণ করেছে।
ভারতে অধিকাংশ সাধারণ কিউআর লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কোনো মাশুল দিতে হয় না। একই ধরনের সুবিধা রয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতেও। ইন্দোনেশিয়াতেও ফি বাংলাদেশের তুলনায় কম। এসব নীতির ফলে ওই দেশগুলোতে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বেড়েছে এবং নগদ অর্থের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশেও যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মাশুল কমানো বা তুলে দেওয়া হয়, তাহলে বাংলা কিউআরের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতেই বাংলা কিউআরকে সর্বজনীন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত লেনদেনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করছে এবং ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কিউআর স্টিকার বিতরণ করলেই ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ঘটবে না। এর জন্য প্রয়োজন সব ব্যাংক ও আর্থিক সেবাকে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিশোধ ব্যবস্থার আওতায় আনা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষের হাতে সহজলভ্য দামে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়া।
বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও মাশুল, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাব এই উদ্যোগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ কমানো, ব্যবহারবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলা কিউআর ভবিষ্যতে দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

