প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা গ্যাস সংকটের পর দেশের জ্বালানি খাতে কিছুটা স্বস্তির আভাস দেখা দিতে শুরু করেছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ থাকা মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ শেষ করে আবারও আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ভোররাত থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে ধাপে ধাপে সরবরাহ শুরু হওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আজ রাত থেকেই গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং আবাসিক খাতে চলমান সংকট ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) প্রকৌশলী মো. শহীদুল হক জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের মেরামত শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে এটি পর্যবেক্ষণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ভোররাত থেকেই ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আগে থেকেই সচল থাকা টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং নতুন করে চালু হওয়া টার্মিনাল থেকে প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারিগরি বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে খুব শিগগিরই টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হবে এবং তখন জাতীয় গ্যাস সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে।
গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করায় সবচেয়ে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সিএনজি স্টেশনগুলোতে। গত কয়েকদিন ধরে যেখানে দীর্ঘ সারি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা ছিল নিয়মিত চিত্র, সেখানে এখন অনেক জায়গায় যানবাহনের চাপ কমতে শুরু করেছে।
চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকার একটি জ্বালানি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক জানান, সংকট চলাকালে গ্যাসের চাপ ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছিল, যদিও স্বাভাবিক অবস্থায় তা প্রায় ২২০ থাকে। চাপ কমে যাওয়ায় একটি গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছিল। তবে বর্তমানে আবার ২২০ মাত্রার চাপ পাওয়া যাচ্ছে এবং যানবাহনের দীর্ঘ সারিও প্রায় নেই।
শুধু পরিবহন খাত নয়, আবাসিক গ্রাহকেরাও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি অনুভব করতে শুরু করেছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সকালে রান্নার সময় স্বাভাবিকের কাছাকাছি গ্যাস পাওয়া গেছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে যারা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তারা আবারও পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করতে পারছেন।
উল্লেখ্য, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। একই সঙ্গে পরিবহন খাতেও জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি মাত্র এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যদিও টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না, তবুও জাতীয় গ্রিডে নতুন করে গ্যাস যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত মিলছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, কারিগরি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই শিল্প, পরিবহন এবং আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।

