বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্প একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। বিশ্ববাজারে “সোনালি আঁশ” নামে পরিচিত এই পণ্যের চাহিদা এখনো রয়েছে, বরং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়তে থাকায় নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। দেশে কাঁচা পাটের উৎপাদন বাড়লেও গত পাঁচ বছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় প্রায় ২৯ শতাংশ কমে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার ২০২৬-২০৩১ মেয়াদের একটি পাঁচ বছরব্যাপী কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো উৎপাদনে আধুনিকায়ন, মূল্য সংযোজন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দ্বিগুণে উন্নীত করা।
পাট অধিদপ্তর প্রণীত “বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩১)” অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় ২০৩১ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১১ দশমিক ৫ থেকে ১২ দশমিক ০ মিলিয়ন বেলে উন্নীত করা, পাটবীজ উৎপাদনে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং মোট রপ্তানিতে মূল্য সংযোজিত পণ্যের অংশ বর্তমানের ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের এই বৈশ্বিক চাহিদা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁচা পাট উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেই বাজারে প্রত্যাশিত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি।
সরকারি কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় রেকর্ড ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর টানা চার বছর রপ্তানি কমতে কমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৮২০ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৯ শতাংশ রপ্তানি আয় হারিয়েছে খাতটি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পতনের কারণ উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। বরং প্রধান সমস্যা হলো মূল্য সংযোজিত পণ্যের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার, নতুন পণ্যের অভাব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া।
এই বাস্তবতায় সরকার কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অধিক মূল্য সংযোজিত প্রস্তুত পণ্য উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিকল্পনায় পাট দিয়ে ভূমি সংরক্ষণে ব্যবহৃত বিশেষ বস্ত্র, পরিবেশবান্ধব মোড়ক, গৃহসজ্জার সামগ্রী, যৌগিক উপাদান, প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র, ফ্যাশনপণ্য এবং মোটরযানের বিভিন্ন উপাদান তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের বড় একটি সমস্যার জায়গা হলো আন্তর্জাতিক মান যাচাই। বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার না থাকায় পণ্যের নমুনা বিদেশে পাঠাতে হয়। এতে প্রতিটি পরীক্ষায় ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয় এবং সময় লাগে ১০ থেকে ২১ দিন। অথচ ভারতে একই পরীক্ষা ৬০ থেকে ১৫০ ডলারে এবং মাত্র ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। চীনেও একই ধরনের সুবিধা রয়েছে।
এই ব্যয় ও সময়ের ব্যবধান বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে। তাই নতুন পরিকল্পনায় তিন থেকে চারটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত বিধিমালা, বিশেষ করে ডিজিটাল পণ্য পরিচিতি ব্যবস্থা অনুসরণে শিল্পকে প্রস্তুত করা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং পুরো পাট খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নুরুল বাসির জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন থেকে ৪৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনায় পাট খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে আটটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো কৃষি পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নতমানের বীজ নিশ্চিত করা, পাটকল আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার গড়ে তোলা, নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে পাট অধিদপ্তর। পাশাপাশি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেবে। পরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কৌশলপত্রে দীর্ঘদিনের কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক, সীমান্ত দিয়ে কাঁচা পাট পাচার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়, সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য এবং মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর ঘাটতি খাতটির উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বর্তমানে দেশের ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা কমার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে পাট অধিদপ্তরও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল সংকটে কাজ করছে, যা বাস্তবায়ন সক্ষমতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পাটবীজের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা কমাতে গবেষণা, প্রত্যয়নপ্রাপ্ত বীজ উৎপাদন এবং কৃষক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের মোট চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ১৫২টি দেশে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করলেও মোট রপ্তানির প্রায় ৬৩ শতাংশ নির্ভর করছে মাত্র তিনটি বাজার—তুরস্ক, চীন ও ভারতের ওপর। এই নির্ভরতা কমাতে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় নতুন বাজার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতা সংযোগ এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগও থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা যত বাড়ছে, বাংলাদেশের পাট শিল্পের সামনে তত বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিল্প, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী উপস্থিতি। পাঁচ বছরের এই কৌশলগত পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পাট শিল্প শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবেই ফিরে আসবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি এবং কর্মসংস্থানেও নতুন গতি সঞ্চার করতে সক্ষম হবে।

