দেশের চলমান গ্যাস সংকট সামাল দিতে আরও এক কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর এক দিন আগেই আট কার্গো এলএনজি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে মাত্র দুই দিনের মধ্যে মোট নয় কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলো।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহে তৈরি হওয়া ঘাটতি। বিশেষ করে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে।
শুক্রবার, ৭ আগস্ট বিকেলে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনলাইন বৈঠকে নতুন কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে এই এলএনজি কেনা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আট কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেয়। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের চারটি পৃথক প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমান থেকে দুই কার্গো করে মোট আট কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর পরদিনই আরও একটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হলো।
দেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ মহেশখালীর এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বিপর্যয়। গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য খাতে এর প্রভাব পড়ে।
সমুদ্রপথে আমদানি করা এলএনজি সরাসরি জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় ব্যবহার করা যায় না। মহেশখালীতে থাকা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের মাধ্যমে এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করার পর তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
মহেশখালীতে এ ধরনের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। ফলে একটি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং তথ্যবাহী কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে টার্মিনালটির কার্যক্রম প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়।
পরে প্রয়োজনীয় মেরামত শেষে টার্মিনালের একটি ইউনিটের বয়লার চালু করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকে এক্সিলারেট এনার্জির ওই টার্মিনাল থেকে সীমিত পরিসরে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।
তবে সীমিত সরবরাহ দিয়ে দেশের আগের ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই সরকার অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার একটি অংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হলেও শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।
এ অবস্থায় অতিরিক্ত এলএনজি কেনার সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো আমদানি বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা।
তবে শুধু অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করলেই দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে না। আমদানি ব্যয়, বৈশ্বিক বাজারের মূল্য, টার্মিনালের সক্ষমতা এবং দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন—সব বিষয়ই একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
গ্যাসের ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমাতে হয়। আবার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
ফলে গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প উৎপাদন কমলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং রপ্তানিমুখী শিল্পও চাপের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত অতিরিক্ত আমদানি সরবরাহ ঘাটতি সামাল দেওয়ার একটি উপায় হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা একটি বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কতটা নির্ভরশীল। একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তাই তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসতে পারে।
বর্তমানে সরকারের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে আমদানির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
এক দিনের ব্যবধানে আট কার্গোর পর আরও এক কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, সরকার সংকট মোকাবিলায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় উৎপাদন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

