রাজধানীর বাজারে কয়েক দিনের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, শুক্রবার সেই মরিচই পাওয়া গেছে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে দাম কমেছে প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আমদানি করা কাঁচা মরিচ বাজারে আসার পর সরবরাহ বেড়েছে। আর সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করেছে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া মরিচের দাম। তবে কাঁচা মরিচে এই স্বস্তি এলেও সামগ্রিক নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। বরং মাছ, ডিম ও বেশির ভাগ সবজির দাম এখনো চড়া রয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কাঁচা মরিচের বাজারে আমদানির প্রভাব সরাসরি দেখা গেলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার কারণে অনেক সবজির সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে এসব পণ্যের পাইকারি দামও বেশি। পাইকারিতে দাম বেশি থাকায় খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের পক্ষেও দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী তাসলিম বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা কাঁচা মরিচ বাজারে আসার পর সরবরাহ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামে। তবে অন্য অনেক সবজির সরবরাহ কম থাকায় সেগুলোর দাম এখনো আগের মতোই বেশি।
বাজারের এই পরিস্থিতি মূলত দুটি ভিন্ন প্রবণতা তুলে ধরছে। একদিকে আমদানির মাধ্যমে কোনো পণ্যের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো গেলে তার দাম কমছে। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে আমদানি না থাকায় অন্যান্য পণ্যের দাম কমছে না।
কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রে গত এক সপ্তাহের পরিবর্তনটি বেশ স্পষ্ট। কিছুদিন আগেও বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে প্রতি কেজি মরিচের দাম ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় এই পণ্য কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমদানি করা মরিচ বাজারে প্রবেশ করতেই সরবরাহ বাড়ে এবং দাম দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে।
তবে বাজারে স্বস্তি ফিরতে হলে শুধু একটি পণ্যের দাম কমলেই হবে না। সামগ্রিক নিত্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া জরুরি। শুক্রবারের বাজারদর অন্তত সেটিই বলছে।
কাঁচা মরিচের দাম কমলেও বেশির ভাগ সবজির বাজারে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় অনেক সবজির পাইকারি দাম এখনো বেশি।
শুক্রবার লম্বা বেগুন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং গোল বেগুন ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। শসার দাম ছিল মানভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। কাঁচা পেঁপে আগের মতোই ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
ঝিঙা, ধুন্দুল ও চিচিঙ্গার দামও আগের অবস্থানেই রয়েছে। এসব সবজি প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। কচুর দাম ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা।
পটোল ও করলার দামও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। পটোল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং করলা ৯০ থেকে ১২০ টাকা দরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সবজির সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে বন্যার প্রভাবে উৎপাদন ও পরিবহনে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পাইকারি বাজারে পড়ে। সেখান থেকে সেই বাড়তি ব্যয় চলে আসে খুচরা বাজারে।
সবজির পাশাপাশি ডিমের বাজারেও গত কয়েক দিনে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। দুই সপ্তাহ আগে এক ডজন বাদামি ডিম সর্বোচ্চ ১৪০ টাকায় বিক্রি হলেও গত সপ্তাহের শুরুতে একই ডজন ডিমের দাম বেড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় ওঠে।
অর্থাৎ, খাদ্যতালিকার তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষ হিসেবে পরিচিত ডিমের দামও এখন আগের তুলনায় বেশি। ফলে একদিকে সবজির দাম বেশি, অন্যদিকে ডিমের দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
পেঁয়াজের বাজারেও আগের উচ্চ দাম বহাল রয়েছে। শুক্রবার প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়।
তবে আলুর বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি আলু ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ বাজারের সব পণ্যের দাম একইভাবে বাড়ছে না; কিছু পণ্যে স্থিতিশীলতা থাকলেও অন্য অনেক পণ্যে এখনো উচ্চমূল্য বিরাজ করছে।
মাংসের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। শুক্রবার ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এসব মুরগির দাম গত কয়েক দিনে মোটামুটি একই অবস্থায় রয়েছে। ফলে মাংসের বাজারে নতুন করে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি না হলেও দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
সবজি ও ডিমের পাশাপাশি মাছের বাজারে গত সপ্তাহে নতুন করে দাম বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
শুক্রবার ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ১৫০ টাকা দরে। দেশি রুইয়ের দাম ছিল ৬৫০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা। চিংড়ি বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং বোয়াল ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা কেজি দরে।
শুধু এসব মাছ নয়, বাজারে পাওয়া অন্যান্য চাষের মাছের দামও গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ফলে কাঁচা মরিচের দামে বড় ধরনের পতন হলেও মাছের বাজারে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে সামগ্রিক বাজারে ক্রেতাদের স্বস্তি ফেরার বদলে এক পণ্যে স্বস্তি এবং অন্য পণ্যে বাড়তি চাপ—এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
কাঁচা মরিচের সাম্প্রতিক দামের পরিবর্তন বাজার ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। কোনো পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে এবং দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে দ্রুত আমদানির সুযোগ তৈরি করা হলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আসতে পারে। কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই হয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি-খুচরা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাও জরুরি।
বিশেষ করে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কোন অঞ্চল থেকে কত পরিমাণ পণ্য বাজারে আসছে, কোথায় সরবরাহ কমছে এবং কোন পথে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে একটি পণ্যের দাম কমলেও অন্য কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের মোট খাদ্য ব্যয় একইভাবে বাড়তে থাকবে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তাই শুধু কাঁচা মরিচের দাম কমার খবর নয়। বরং এটি দেখাচ্ছে, সরবরাহ বাড়লে বাজারে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হলেও দেশের খাদ্যপণ্যের বাজারে স্থায়ী স্বস্তির জন্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন।
কাঁচা মরিচের দাম কমায় ক্রেতারা আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেলেও মাছ, ডিম ও বেশির ভাগ সবজির উচ্চ দাম সেই স্বস্তিকে সীমিত করে রাখছে। বাজারে প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে তখনই, যখন একসঙ্গে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে।

