জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমিকে টেকসই ও উৎপাদনশীল কৃষি ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি ও পরিকল্পনা শাখার যুগ্ম সচিব কামরুল হাসান জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ৪৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ কৃষিজমিতে টেকসই কৃষি চর্চা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৫০ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গতকাল ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ আয়োজিত ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
কামরুল হাসান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি চর্চার দিকে যেতে হবে। এতে একদিকে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থাও সুরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি খরা, বন্যা, অতিরিক্ত আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে কৃষকদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে এবং মাটির গুণগত মানও উন্নত হবে।
এলডিসি উত্তরণে সবুজ ভর্তুকির ওপর গুরুত্ব
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে সরাসরি নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে ‘গ্রিন বক্স’ বা পরিবেশবান্ধব কৃষি ভর্তুকির দিকে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ ধরনের ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন, অবকাঠামো, গুদাম, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা ও বালাই দমন ব্যবস্থায় সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষি বিষয়ক চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্যে খুব কম বা কোনো ধরনের বিকৃতি সৃষ্টি করে না—এমন সরকারি সহায়তাকে গ্রিন বক্স ভর্তুকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রপ্তানিকারকদের পরিবহন, প্যাকেজিং, পণ্য ওঠানো-নামানো এবং বাজার সম্প্রসারণেও সরকারি সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে উদ্বেগ
কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করেন কামরুল হাসান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ১৫টি কৃষিপণ্যের জন্য উত্তম কৃষিচর্চা বা জিএপি প্রটোকল তৈরি করেছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতে পরীক্ষাগার সুবিধা উন্নয়নেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়ার উদাহরণ হিসেবে পেঁয়াজের আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশে প্রায় ৭ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭০ হাজার টনে নেমেছে।
পুষ্টিতে উন্নতি হলেও নতুন চ্যালেঞ্জ
দেশে শিশুদের খর্বাকৃতি হওয়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১২-১৩ সালে এ হার ৪৩ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ২৪ শতাংশ হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে এ অগ্রগতির গতি কিছুটা কমে যায়।
একই সঙ্গে শিশুদের অতিরিক্ত রোগা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত ওজনের হার বাড়ার বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পুষ্টিগত বৈষম্যের কথাও তুলে ধরা হয়। দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও একক ফসলনির্ভর কৃষির কারণে এসব এলাকায় শিশুদের খর্বাকৃতি ও অতিরিক্ত রোগা হওয়ার হার তুলনামূলক বেশি। নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার বাড়াও উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন কামরুল হাসান।
এ সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি মন্ত্রণালয় পুষ্টিসংবেদনশীল কৃষি কৌশল গ্রহণ করেছে।
কৃষকের আয় বাড়াতে গবেষণায় বিনিয়োগ
কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন কামরুল হাসান। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের ১০ ধরনের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি উপকরণ কেনায় শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা, আধুনিক কৃষি পদ্ধতির নির্দেশনা, কৃষি বিমা এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা ও নতুন উদ্যোগে সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল বীজ ও সার উদ্ভাবনে কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা শক্তিশালী করা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জীবসুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে ছোট আকারের হিমাগার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণে অপচয় কমাতে বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা আরও কমানো সম্ভব হবে।

