চীনের বাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা সরে যাওয়ার পর বিশ্ব পোশাকবাজারে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। চীনের হারানো ক্রয়াদেশ নিজেদের দখলে নিতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনেও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান দেশটির পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারত।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। শুল্কের হিসাবে এগিয়ে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কাঙ্ক্ষিত ক্রয়াদেশ টানতে পারছে না বাংলাদেশ। বরং একই সময়ে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ তাদের রপ্তানি বাড়িয়ে বাংলাদেশের বাজার-অংশ দখল করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে শুধু শুল্ক বা মূল্য নয়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ। পণ্যের বৈচিত্র্য কম, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক তৈরির সক্ষমতা সীমিত, কাঁচামাল সংগ্রহে সময় বেশি লাগে এবং বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার জটিলতায় সরবরাহের সময়ও বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
বাজার বদলেছে, উৎপাদনের ধরন বদলায়নি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভর করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ট্রাউজার, টি-শার্ট, বোনা কাপড়ের আনুষ্ঠানিক শার্ট, অন্তর্বাস ও সোয়েটার—এই পাঁচ ধরনের মৌলিক পোশাক দেশের রপ্তানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
এই পাঁচ ধরনের পণ্য থেকেই বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৭৮ শতাংশ আসে। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানা এসব পণ্য উৎপাদন করে।
একসময় এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা ছিল। কটন বা সুতি কাপড়ভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে দেশের কারখানাগুলো দক্ষতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে এসব পণ্যকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু বিশ্ববাজারের চাহিদা স্থির নেই। ক্রেতাদের পছন্দে গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পোশাকের ৫৭ শতাংশই ছিল কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্য। অর্থাৎ দেশটির পোশাকবাজারের অর্ধেকেরও বেশি এখন এমন পোশাকে দখলে, যেগুলোর উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।
এখানেই বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। যে বাজারে ক্রেতারা নতুন ধরনের কাপড়, নকশা ও ব্যবহারভিত্তিক পোশাক চাইছেন, সেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পুরোনো চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
ক্রয়াদেশের হিসাবেই স্পষ্ট পিছিয়ে পড়ার চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাকবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সোয়া তিন বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি কমেছে ৮.১ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেড় শতাংশ বেড়েছে।
শুধু ভিয়েতনাম নয়, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াও চীনের হারানো বাজারের একটি অংশ দখল করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.৪৯ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৪.৯ শতাংশ।
এই সময়ে ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ১.৯৭ বিলিয়ন ডলারের এবং কম্বোডিয়া ১.৭৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে।
অর্থাৎ একই বাজারে যখন কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, তখন বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি কমার মুখে পড়েছে।
ভিয়েতনাম কেন এগিয়ে?
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনামের সুবিধা শুধু কম সরবরাহের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি পণ্যের বৈচিত্র্য, কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও এগিয়ে রয়েছে।
কৃত্রিম তন্তু বা কটনবিহীন পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের দখল মাত্র ৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের দখল প্রায় ১০ শতাংশ।
বিশ্বের পোশাকবাজারে যখন সুতি পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, তখন এই ব্যবধান বাংলাদেশের জন্য বড় প্রতিযোগিতামূলক সমস্যা হয়ে উঠছে।
ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধাও কাজে লাগাতে পারছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও চুক্তির কারণে দেশটির রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক, দীর্ঘ সরবরাহকাল এবং সীমিত পণ্যের ওপর নির্ভরতার সমস্যায় আটকে আছে।
সরবরাহের সময়েও বড় ব্যবধান
পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু পণ্যের দাম বা মান নয়, সময়মতো সরবরাহও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতারা দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অল্প সময়ে পণ্য হাতে পেতে চান।
এই জায়গাতেও বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের সাবেক শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা এসএম আবু তৈয়বের মতে, চীনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ভিয়েতনাম মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যে চীন থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে। এতে তাদের উৎপাদন ও সরবরাহের সময় কমে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় ১৮ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার প্রশাসনিক জটিলতা এই সময় আরও বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে উৎপাদন পরিকল্পনা ও সময়মতো পণ্য সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে এই দীর্ঘ সরবরাহকাল বড় অসুবিধা। কারণ ক্রেতারা এখন এমন সরবরাহকারী খুঁজছেন, যারা দ্রুত নকশা পরিবর্তন, দ্রুত উৎপাদন এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে।
ইউরোপের বাজারেও একই সংকেত
সমস্যাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারা চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২,৭৭৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে।
এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৪২ শতাংশ কম।
তবে সামগ্রিক আমদানি কমার তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পতন আরও বেশি। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ৬০৯ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫৪ কোটি ইউরো।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৯.৩৩ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সমস্যাটি কেবল একটি দেশের বাজারে শুল্ক বা চাহিদার পরিবর্তনের বিষয় নয়। বরং বিশ্ব পোশাকবাজারে পরিবর্তিত প্রতিযোগিতার সঙ্গে দেশের উৎপাদন কাঠামো কতটা মানিয়ে নিতে পারছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের বড় সুযোগ ছিল
তবু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।
২০২৬ সালের ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর নতুন মার্কিন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের জন্য কার্যকর মোট শুল্কহার প্রায় ২৫.৬ শতাংশ। একই ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের শুল্কহার ২৮.১ শতাংশ এবং চীনের ৩৫.৬ শতাংশ।
অর্থাৎ শুল্কের দিক থেকে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম ও চীনের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাককে তুলনামূলক কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়। তাত্ত্বিকভাবে এই সুবিধা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ক্রয়াদেশ পাওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
কারণ শুল্ক কম হলেও ক্রেতা যদি কাঙ্ক্ষিত ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে না পান, তাহলে শুধু শুল্ক সুবিধা দিয়ে ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন।
এখানেই কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।
কটননির্ভরতা এখন শক্তি থেকে দুর্বলতায়
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্যের ইতিহাসের সঙ্গে কটনভিত্তিক পোশাকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এই খাতে দক্ষতা, শ্রমশক্তি, কারখানা, কাঁচামাল এবং ক্রেতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বিশ্ববাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে এই পুরোনো শক্তিই এখন কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খেলাধুলার পোশাক, শরীরচর্চাভিত্তিক পোশাক, বিশেষ বৈশিষ্ট্যের পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশ যদি এই বাজারের বড় অংশে প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সুবিধা থেকেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
এর ফলে দুটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একদিকে বাজারের বড় অংশের চাহিদা বাংলাদেশ পূরণ করতে পারছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা যখন বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্রয়াদেশ ভাগ করছেন, তখন সব ধরনের পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে সমানভাবে বিবেচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বিনিয়োগে বড় বাধা উৎপাদন খরচ
কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের জন্য নতুন ধরনের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও কাঁচামালের প্রয়োজন। এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরীর মতে, বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
তার মতে, এই ধরনের পোশাক উৎপাদনের খরচ বেশি হওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই বড় ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যৌথ উদ্যোগে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তিনি কৃত্রিম তন্তু উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
অর্থাৎ শুধু কারখানা তৈরি করলেই হবে না; বিনিয়োগের পরিবেশ, ঋণের খরচ, প্রযুক্তি এবং কাঁচামালের সরবরাহ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতিও বড় বিষয়
ভিয়েতনামের পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এর ফলে দেশটির উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, নতুন ধরনের পণ্য তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বাংলাদেশে এই ধরনের বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম।
বিদেশি বিনিয়োগ এলে শুধু অর্থ আসে না; এর সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন পণ্য তৈরির জ্ঞানও আসে।
ফলে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের মতো উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশকে এগোতে হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বাণিজ্য চুক্তিও হতে পারে প্রতিযোগিতার হাতিয়ার
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বাংলাদেশের আরও বেশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোনো প্রয়োজন।
বিশ্বের যেসব দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করে, তাদের সঙ্গে সহজ বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হলে রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে পণ্য পাঠাতে পারবেন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সুবিধা যখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, তখন বাজার ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশল জরুরি।
শুধু একটি দেশের শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সামনে কী করা দরকার?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু আরও বেশি পোশাক উৎপাদন নয়; বরং বাজার যে ধরনের পোশাক চাইছে, সেই ধরনের পণ্য দ্রুত ও প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন করা।
এ জন্য প্রথমেই কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার জটিলতা কমানোও জরুরি। সরবরাহের সময় ১৮ থেকে ৩০ দিন থেকে কমিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি আনতে না পারলে শুধু কম শুল্ক দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।
এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন দক্ষ জনবল তৈরি করাও প্রয়োজন।
সামনে সুযোগ আছে, কিন্তু সময়ও কম
বাংলাদেশের সামনে এখনো বড় সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামো সেই সুযোগকে আরও স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশের কার্যকর মোট শুল্কহার প্রায় ২৫.৬ শতাংশ, যা ভিয়েতনামের ২৮.১ শতাংশ ও চীনের ৩৫.৬ শতাংশের তুলনায় কম।
কিন্তু এই সুবিধা তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, যখন বাংলাদেশ বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে পারবে।
চীনের বাজার থেকে ক্রেতারা সরে যাওয়ার পর যে জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটি চিরস্থায়ী নয়। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগীরা ইতোমধ্যে সেই জায়গা দখলের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি এখন আর শুধু শুল্ক কত কম, তা নয়। প্রশ্ন হলো—এই সুবিধা কাজে লাগানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা বাংলাদেশ কত দ্রুত তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে কটননির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এখন সেই শক্তির সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, কৃত্রিম তন্তু, দ্রুত সরবরাহ ও বহুমুখী পণ্য যুক্ত করা না গেলে পুরোনো সাফল্য ধরে রাখাই কঠিন হতে পারে।
বিশ্ববাজার বদলাচ্ছে দ্রুত। বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি পথ—পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্ষমতা বাড়ানো, অথবা শুল্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ক্রয়াদেশের প্রতিযোগিতায় অন্যদের কাছে আরও পিছিয়ে পড়া।

