স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ যত এগিয়ে আসছে, ততই সামনে আসছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের কঠিন বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে গেলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো এবং দেশীয় শিল্পকে অন্যায্য আমদানি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় রূপান্তরের সূচনা। এতদিন যেসব সুবিধা তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া গেছে, উত্তরণের পর সেগুলোর অনেকটাই সীমিত হবে। ফলে তখন প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হবে পণ্যের মান, উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি, দক্ষতা, দ্রুত সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশল।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। তবে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর জন্য সরকার ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির কাছে আবেদন করেছে।
কমিটি বাংলাদেশের প্রস্তুতির সময় বাড়ানো উপযুক্ত হতে পারে বলে মত দিয়েছে। তবে এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির শর্তও রয়েছে।
২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ কমিটির সিদ্ধান্ত নোট করেছে এবং ২৪ নভেম্বরের আগে এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন একই সঙ্গে দুটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—একদিকে উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, অন্যদিকে অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া এই উত্তরণকে টেকসই করা কঠিন হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ১২টি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম রাখা হচ্ছে।এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো, বাণিজ্য সহজ করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা জোরদার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো।
তবে এসব উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই হবে মূল বিষয়।কারণ বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়। একই সঙ্গে দেশের বাজারে বিদেশি পণ্যের বাড়তি প্রতিযোগিতা সামলাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান ধরে রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের জন্য তৈরি করা ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।
শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে বিদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়তে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম দামে পণ্য আমদানির কারণে স্থানীয় শিল্প চাপের মুখে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে তিন ধরনের বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে—অ্যান্টি ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড।
সহজ ভাষায়, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে এবং তাতে বাংলাদেশের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যান্টি ডাম্পিং ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আবার কোনো দেশের সরকার রপ্তানিকারকদের বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে সুবিধা দিলে এবং সেই কারণে বাংলাদেশের শিল্প ক্ষতির মুখে পড়লে কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে কোনো পণ্যের আমদানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দেশীয় শিল্পে গুরুতর ক্ষতি বা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করলে সাময়িক সুরক্ষার জন্য সেফগার্ড ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়।
এসব ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বৈধ। অর্থাৎ এগুলো নির্বিচারে বিদেশি পণ্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; বরং অন্যায্য বাণিজ্য বা আকস্মিক আমদানিজনিত ক্ষতি মোকাবিলার আইনি উপায়।
বাংলাদেশে বাণিজ্য সুরক্ষা তদন্তের আইনি ভিত্তি থাকলেও বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কারণ কোনো বাণিজ্য বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ করলেই হয় না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য যাচাই, দেশের শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, বাজারের তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য দক্ষ জনবল দরকার।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে তাই সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য সুরক্ষা সহায়তা কেন্দ্র, যৌথ বাণিজ্য সুরক্ষা সেল, তথ্য বিনিময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একাডেমিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।এর মাধ্যমে গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একটি বা কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় ধরে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক ও কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু এসব খাতের সম্ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা পরিবর্তিত বা সংকুচিত হতে পারে। তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট হবে না।
কোন বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, কী ধরনের মান ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ করতে হবে এবং কীভাবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম খরচে পণ্য সরবরাহ করা যায়—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন কৌশল তৈরি করতে হবে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা রপ্তানিকারকদের কাজ নয়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন খরচ কমানো কঠিন হবে। একইভাবে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে না।
বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে চান। কিন্তু নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, অর্থায়নের উচ্চ খরচ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাই এলডিসি উত্তরণকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রস্তুতি পরিকল্পনার সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের সংস্কারকেও যুক্ত করতে হবে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
বিশেষ করে এলডিসি-নির্দিষ্ট বাজার সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এর প্রভাব মোকাবিলায় রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন বাজার খোঁজা, বাণিজ্য চুক্তি করা এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থাৎ উত্তরণের পর বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে অন্য দেশ কী সুবিধা দিচ্ছে তার ওপর নয়, বরং বাংলাদেশ নিজে কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারছে তার ওপর।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করা হলেও শুধু সময় বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
তার মতে, একই সঙ্গে সংস্কারমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে এবং অর্থনীতিকে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানি পণ্য ও রপ্তানির বাজার বহুমুখী করার ওপর জোর দিতে হবে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ বাড়তি সময় পাওয়া গেলেও সেই সময় যদি কাঠামোগত পরিবর্তনে কাজে না লাগানো যায়, তাহলে উত্তরণের পর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই উত্তরণকে টেকসই করা।
তার মতে, এলডিসি সুবিধা থেকে বেরিয়ে গেলে রপ্তানি, ওষুধশিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেই উত্তরণের দিকে এগোনো উচিত।
এই বক্তব্য থেকেই বাংলাদেশের সামনে থাকা মূল বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এলডিসি উত্তরণকে পিছিয়ে দেওয়া বা নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রস্তুতির মান বাড়ানো।
বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা হবে কয়েকটি স্তরে—পণ্যের দাম, মান, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, সরবরাহের গতি, বাণিজ্য চুক্তি এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সক্ষমতা।
এ কারণে এলডিসি উত্তরণকে শুধু সুবিধা হারানোর গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগও হতে পারে।
তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন শিল্পকে কীভাবে আধুনিক করা হবে, কোন পণ্যে বিনিয়োগ বাড়বে, কোন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করা হবে এবং বিদেশি প্রতিযোগিতার মুখে দেশীয় শিল্পকে কীভাবে ন্যায্য সুরক্ষা দেওয়া হবে।
সময় খুব বেশি নেই। ২৪ নভেম্বরের উত্তরণ সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রস্তুতির আসল পরীক্ষা এখন কাগজে-কলমে পরিকল্পনা তৈরিতে নয়, বরং সেগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেখানেই।

