বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা শুধু এলএনজির ঘাটতি নয়, বরং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বেশিরভাগ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে আরও বেশি এলএনজি আমদানি। এতে প্রশ্ন উঠছে, দেশের জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সমাধান কি শুধু আমদানি বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
চলতি বছরের ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৩ আগস্ট সামিট গ্রুপের টার্মিনালও বন্ধ হয়ে গেলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে আসে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করলেই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। বরং দেশের গ্যাস উৎপাদন, বিদ্যুৎ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অবকাঠামোর সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আগের সরকারের সময় এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নীতিতে এলএনজি আমদানির দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়ার কথা থাকলেও গ্যাস পরিমাপ ব্যবস্থা, সরবরাহ অবকাঠামো এবং পাইপলাইন ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই রাখা হয়। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে আগ্রহ দেখায়নি।
বর্তমানে সচিবালয়ে পড়ে থাকা এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হয়নি।
এরপর নতুন করে মালয়েশিয়া থেকে কনটেইনারে এলএনজি এনে সরাসরি কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহের একটি প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গ্যাস রূপান্তর ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
একটি ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতার যন্ত্রের দাম প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। কতগুলো যন্ত্র প্রয়োজন হবে, কে এগুলো স্থাপন করবে, পরিচালনা খরচ কত হবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যবস্থা গ্রহণে কতটা আগ্রহী—এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়।
পরিকল্পনা ছাড়া শুধু নতুন ধারণা সামনে আনা কার্যকর নীতির বিকল্প হতে পারে না।
এর পাশাপাশি তিনটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার। হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় এসব টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করা।
এর আগে কুতুবজোমে চীনের সহযোগিতায় আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল তৈরি করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। পরিবেশগত অনুমোদন, পাইপলাইন নির্মাণ, গ্যাস পরিমাপ ব্যবস্থা এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ শেষ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ফলে আজ সিদ্ধান্ত নিলেও এসব প্রকল্প থেকে বাস্তব সুবিধা পাওয়া ২০৩০ সালের আগে কঠিন হতে পারে।
ততদিনে সঠিক নীতি গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ অন্য উৎস থেকেও পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
হিরণ পয়েন্টের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। স্থানটি মোংলা বন্দর থেকে নদীপথে ১৩১ কিলোমিটার দূরে। খুলনায় জাতীয় গ্যাস পাইপলাইনের সংযোগ পেতে আরও প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রয়োজন হবে।
এই পথে রয়েছে অসংখ্য নদী ও খাল, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। ফলে পরিবেশগত অনুমোদন পাওয়া এবং বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
মোংলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। পশুর নদীতে বড় জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। বর্তমানে বড় জাহাজ হাড়বাড়িয়া এলাকায় নোঙর করে ছোট নৌযানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা হয়। কিন্তু এলএনজির মতো ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি একইভাবে পরিবহন করা কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মোংলা বন্দর সুন্দরবনের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। এর আগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ জানিয়েছিল বিভিন্ন মহল। ফলে নতুন কোনো বড় জ্বালানি প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পায়রাতেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। এর আগে সেখানে এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দেখা যায়, রামনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা এলএনজি পরিবহনের জন্য যথেষ্ট নয়। খনন বা বিকল্প ব্যবস্থার খরচ প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে কঠিন করে তোলে।
এমনকি পায়রায় টার্মিনাল তৈরি হলেও দেশের প্রধান শিল্প ও বিদ্যুৎ চাহিদার কেন্দ্র ঢাকা, মেঘনাঘাট ও গাজীপুরে গ্যাস পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এর আগে ভোলা থেকে ঢাকায় গ্যাস আনার পরিকল্পনাও ব্যয়ের কারণে বাতিল হয়েছিল। ৪৮ কিলোমিটার গ্যাস পরিবহনের অবকাঠামো তৈরি করাই যেখানে কঠিন হয়েছে, সেখানে শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ কতটা বাস্তবসম্মত—সে প্রশ্ন রয়েছে।
তাই জ্বালানি সংকট সমাধানে শুধু নতুন আমদানিনির্ভর প্রকল্প নয়, বরং বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রথমত, দেশজুড়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বড় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রচারণা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক, কর ও মূল্য সংযোজন কর কমানো বা দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাহারের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ সহজ করতে কার্যকর নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
চতুর্থত, রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে এলপিজি ও বিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পঞ্চমত, শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে বিদ্যুৎভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠত, নির্মাণাধীন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে আনার জন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সপ্তমত, যেসব নতুন প্রকল্প দেশের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াবে, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু আরও এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করবে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়—কত বেশি জ্বালানি আমদানি করা যাবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে কম ঝুঁকিতে, কম খরচে এবং টেকসইভাবে দেশের প্রয়োজন মেটানো যায়।

