অক্টোবরের শুরুতে মধ্যবিত্ত পরিবারের টাকা সঞ্চয়ের হিসাবে তিনটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয় জানুয়ারি থেকে জুনের সুদহার জুলাই থেকে ডিসেম্বরের জন্যও বহাল রেখেছে, ফলে স্কিমভেদে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ সুদ ১১ দশমিক ৮২ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২৩ সেপ্টেম্বর ট্রেজারি বন্ডের স্ট্যান্ডার্ড ইল্ড ছিল ২ বছরে ৮ দশমিক ৭৫, ৫ বছরে ৮ দশমিক ৫৩, ১০ বছরে ৮ দশমিক ৩৯, আর ১৫ ও ২০ বছরে ৯ দশমিক ৩৩ ও ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই সরকারের তিন রকম প্রস্তাব, আর এর সঙ্গে আছে ফ্ল্যাট কিনে ভাড়া দেওয়ার চিরচেনা স্বপ্ন। প্রশ্ন হলো, কোনটা সত্যিই লাভের, আর কোনটা শুধু লাভের মতো দেখায়?
সঞ্চয়পত্রের সুদ কি সত্যিই এত ভালো
আগে সঞ্চয়পত্রের গল্পটা বলি, কারণ এখানে একটা নাটক আছে। গত ডিসেম্বরের শেষে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সব সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে ১০ দশমিক ৫৯ থেকে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলে ৪ জানুয়ারি অর্থ বিভাগ সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে আগের হার বহাল রাখার অনুরোধ জানায়। জুনের শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন নতুন করে পুনর্নির্ধারণ হচ্ছে না, এবং ২ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে সেটাই এসেছে। অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ কমানোর পর থেকে হার অপরিবর্তিত আছে। একটা সূক্ষ্ম বিষয় অনেকেই খেয়াল করেন না: কেনার সময় যে হার থাকে, মেয়াদপূর্তিতে সেই হারই পাওয়া যায়। তাই আজ কিনলে আপনি কার্যত পাঁচ বছরের জন্য একটা হার আটকে ফেললেন। এবার কর। আইনে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর ১০ শতাংশ, আর অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী এই কর আর চূড়ান্ত দায় নয়, অগ্রিম কর হিসেবে ধরা হবে। বছর শেষে আপনার মোট আয় ও কর স্ল্যাবের সঙ্গে মিলিয়ে হিসাব হবে, আর ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা এবার চার লাখ টাকা করা হয়েছে। সাড়ে সাত লাখ টাকা ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ সুদে রাখলে বছরে সুদ আসে ৮৮ হাজার ৬৫০ টাকা। ১০ শতাংশ কর কাটলে হাতে থাকে প্রায় ৭৯ হাজার ৮০০ টাকা, মানে নিট সুদহার ১০ দশমিক ৬ শতাংশের কিছু বেশি। মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ ধরলে একই টাকার ক্রয়ক্ষমতা বছরে কমে প্রায় ৬১ হাজার ৯৫০ টাকা, তাই প্রকৃত লাভ থাকে প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশারের সূত্রে একে বলে প্রকৃত সুদহার, যা নামমাত্র সুদ থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিলেই পাওয়া যায়। এখানে সেটা প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
সরকার একই টাকা দুই দামে কিনছে কেন?
এবার আসল ধাঁধা। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে সুদ ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, অথচ পাঁচ বছরের ট্রেজারি বন্ডের স্ট্যান্ডার্ড ইল্ড ৮ দশমিক ৫৩। ফাঁক ৩ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রের হার বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্নির্ধারণের নীতি মেনে চলে, তাই এই ফাঁক নিজে থেকে টিকে থাকার কথা নয়। আমার বিশ্লেষণে সঞ্চয়পত্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাজারের নয়, নীতির। ডিসেম্বরের ঘটনা থেকে আমরা দেখেছি, সরকার কমাতে চাইলেও সামাজিক চাপে ফিরে আসতে হয়, কিন্তু চাপ না থাকলে পরের বার ফল অন্যরকম হতে পারে। জানুয়ারি ২০২৭ এর পর্যালোচনায় নতুন ক্রেতারা কম হার পেতে পারেন, আর যাঁরা আগে কিনেছেন তাঁদের হার অক্ষত থাকবে। এর সঙ্গে আছে সীমা, যেমন পরিবার সঞ্চয়পত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা,এরপর আছে ধৈর্যের পুরস্কার, কারণ এক বছর পর ভাঙালে পরিবার সঞ্চয়পত্রে সুদ ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ, আর পাঁচ বছর পূর্ণ হলে ১১ দশমিক ৯৩।
ট্রেজারি বন্ড নিরাপদ হয়েও কেন কাঁদাতে পারে?
ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর, সুদ সাধারণত ছয় মাস পরপর আসে, আর দায়ী সরকার নিজেই, তাই খেলাপির ঝুঁকি নেই। কিন্তু দুটো কাঁটা আছে। প্রথমটা মূল্যস্ফীতি। সাড়ে সাত লাখ টাকা পাঁচ বছরের বন্ডে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ ইল্ডে রাখলে বছরে সুদ প্রায় ৬৩ হাজার ৯৭৫ টাকা, কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলে প্রায় ৬১ হাজার ৯৫০ টাকা। কর ধরার আগেই লাভ থাকে মাত্র দুই হাজার টাকার মতো। এমনকি ২৮ সেপ্টেম্বরের নিলামে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের কাটঅফ ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ৯৪৯৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্যই বেশি। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দামের খেলা। বন্ডের দাম আর ইল্ড উল্টো দিকে চলে, অর্থাৎ একটা বাড়লে আরেকটা কমে; আর প্রচলিত বন্ড গণিত অনুযায়ী ইল্ড এক শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়লে ১০ বছরের বন্ডের দাম মোটামুটি ৬ থেকে ৭ শতাংশ কমে। উল্টোটাও সত্য: ফেব্রুয়ারিতে ১০ বছরের বন্ডের ইল্ড ছিল ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা ৮ দশমিক ৩৯। তখন যাঁরা কিনেছেন, তাঁদের বন্ডের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে রেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বলেছে মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য, তাই দিক নিশ্চিত নয়। বন্ড তাই তাঁদের জন্য, যাঁরা মেয়াদ পর্যন্ত রাখতে পারবেন বা দামের ওঠানামা সইতে পারবেন।
ভাড়ার আয়ে টাকা কোথায় আটকে যায়?
এবার আসি ফ্ল্যাটে। ঢাকার ভাড়ার আয়ের নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান কম, তাই আমি প্রথম আলোর ২২ সেপ্টেম্বরের একটি উদাহরণ ধরে হিসাব করছি। এক কোটি টাকার ফ্ল্যাটের সমমানের বাসার ভাড়া ও গ্যারেজভাড়া মাসে ৪০ হাজার টাকা হলে বছরে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার, মানে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির অনেক নিচে। সঞ্চয়পত্রের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ নিট সুদের সমান হতে হলে ফ্ল্যাটের দাম বছরে অন্তত প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে হবে, এবং তা-ও নিবন্ধন, কর, ফি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাদ দেওয়ার আগে। দাম বাড়ার নিশ্চয়তাও নেই, কারণ তা নির্ভর করে এলাকা, ভবনের মান ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর। তাছাড়া বড় অঙ্কের টাকা এক জায়গায় আটকে যায়, জরুরি সময়ে দ্রুত নগদ করা কঠিন। তবে নিজের ঠিকানার নিরাপত্তা অনেকের কাছে টাকার অঙ্কের বাইরের মূল্য বহন করে, আর সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই।
তাহলে আমি হলে কী করতাম?
তিনটি প্রতিষ্ঠিত নীতি আমাকে পথ দেখায়। প্রথমটা অপরচুনিটি কস্ট: এক জায়গায় টাকা রাখলে অন্য জায়গার সম্ভাব্য আয় ছাড়তে হয়। দ্বিতীয়টা ফিশারের প্রকৃত সুদের সূত্র, যা বলে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়েই লাভ মাপতে হবে। তৃতীয়টা হ্যারি মার্কোউইৎজের পোর্টফোলিও তত্ত্ব, যা বলে ঝুঁকি কমাতে সব টাকা এক ঝুড়িতে রাখা ঠিক নয়। এগুলো মিলিয়ে আমার হিসাব হলো টাকার কাজ অনুযায়ী ভাগ করা। জরুরি তহবিল রাখুন সহজে ভাঙানো যায় এমন জায়গায়, কারণ এখানে সুদের চেয়ে নগদ পাওয়ার নিশ্চয়তা বড়। এক থেকে তিন বছরের লক্ষ্যের টাকার জন্য স্বল্প মেয়াদি ট্রেজারি বিল বা সঞ্চয়পত্রের ধাপে ধাপে বাড়া সুদ ভেবে দেখা যায়। যে টাকা পাঁচ বছর না ছুঁয়ে থাকতে পারবেন, তার মূল অংশ সঞ্চয়পত্রে রাখা যুক্তিসঙ্গত, কারণ এখন এটিই সবচেয়ে বেশি প্রকৃত সুদ দিচ্ছে এবং কেনার সময়ের হার আটকে যায়, তবে নীতির ঝুঁকি আর সীমার কথা মাথায় রেখে। ট্রেজারি বন্ড ঝুঁকি ভাগ করার জন্য রাখা যায়, তবে দাম ওঠানামা সইতে পারলে। আর ফ্ল্যাটকে আয়ের উৎস না ভেবে বাসস্থান ভাবা ভালো, যেখানে নিশ্চিন্ত ঠিকানার মূল্য একটা আলাদা হিসাব।
সুদের হার দেখে নয়, টাকার কাজ দেখে পথ বাছুন। সরকার আজ যে ফাঁকটা দিচ্ছে, তা চিরদিন থাকবে না, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে সব টাকা এক ঝুড়িতে ঢালাও ঠিক নয়।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

