সারে ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক যাচ্ছে বড় জমির মালিকদের কাছে, আর নিচের দিকের ৪০ শতাংশ ভূমিধারী পাচ্ছেন মাত্র ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ, এমনটাই বলছে বিশ্বব্যাংকের জুন মাসে প্রকাশিত কৃষি খাতের সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা। অথচ এই ভর্তুকির অঙ্কটা ছোট নয়: গত পাঁচ বছরে সারের ভর্তুকি প্রায় চার গুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকায়। আবার একই সময়ে আমন মৌসুমে রংপুর, রাজশাহী, মাগুরার কৃষকরা টিএসপি আর ডিএপির জন্য দোকানে দোকানে ঘুরেছেন, কেউ কেউ সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দিয়েও পাননি, আর সরকার বলছে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। ঘটনা দুটি আপাত দৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও এরা আসলে একই সুতোয় গাঁথা: বেশি সার কিনলে বেশি ছাড়; এই নিয়মে বড় গৃহস্থরাই জিতে যান; আর সারের সংকট দেখা দিলে দিনশেষে পকেটের টান ও প্রভাবহীনতার বলি হন সেই ছোট কৃষকই। এই লেখায় আমি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে শুধু একটি সূত্র হিসেবে নিয়েছি। বাকি হিসাব সরকারি তথ্য, আমদানির চুক্তিমূল্য আর মাঠের খবর মিলিয়ে আমার নিজের হাতে গুছানো; তাই যেই তথ্য যেখান থেকে পাওয়া, সেখানে সেটা উল্লেখ করে দিয়েছি।
‘অর্ধেক বড় কৃষকের’ কথাটা কতটা খাঁটি?
প্রথমে বুঝি ভর্তুকি কীভাবে কাজ করে। সরকার ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি আর এমওপির দাম বেঁধে দেয়, আর আমদানি বা উৎপাদনের খরচ ও সেই বাঁধা দামের ফারাকটা বাজেট থেকে মেটায়। যিনি যত বেশি সার কেনেন, তিনি তত বেশি ফারাকের সুবিধা পান। দেশের ৯২ শতাংশ খামারের জমি আড়াই একরের কম, আর প্রতি দশটির চারটি আধা একরেরও কম জমির প্রান্তিক খামার, যারা মোট আবাদি জমির মাত্র ১১ শতাংশ চাষ করে। এখানে আমার একটা পর্যবেক্ষণ আছে: নিচের ৪০ শতাংশ ভূমিধারী যেখানে জমির প্রায় ১১ শতাংশ চাষ করেন, সেখানে ভর্তুকির ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পান, মানে ভর্তুকিটা কার্যত জমির মাপ ধরেই ভাগ হচ্ছে, আর ছোট কৃষক সম্ভবত জমির তুলনায় কিছুটা বেশি সার দেন বলে তাঁদের ভাগ সামান্য ওপরে। তবে ‘অর্ধেক বড় কৃষকের’ কথাটা জমির হিসাবে খাঁটি, আয়ের হিসাবে ছবিটা কিছুটা নরম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আয়ের নিচের ৪০ শতাংশ খামার পরিবার সরাসরি সুবিধার ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ পায়, আর সবচেয়ে ধনী পাঁচ ভাগের এক ভাগ গ্রহীতার মাত্র ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েও সুবিধার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে যায়। উল্টো দিকের সতর্কতাটাও জরুরি: ভর্তুকির মোট সুবিধা সবচেয়ে গরিব পাঁচ ভাগের এক ভাগের আয়ের ১ দশমিক ০৪ শতাংশ, ধনীদের বেলায় মাত্র ০ দশমিক ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ধনীরা বেশি টাকা পেলেও গরিবের কাছে এটা আয়ের তুলনায় দশ গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর জমির মাপ দিয়ে গরিবি মাপাও পুরো ঠিক নয়, কারণ বিশ্বব্যাংকই বলেছে প্রান্তিক ধান চাষিদের প্রায় তিন চতুর্থাংশ নিজের উৎপাদনের চেয়ে বেশি ভাত খান, ফলে সারের দাম আর চালের দাম, দুই দিক থেকেই তাঁরা চাপে পড়েন। সোজা কথা, ভর্তুকি হঠাৎ তুলে নিলে ক্ষতি হবে গরিবেরই, কিন্তু ভর্তুকি যেভাবে চলছে, লাভও বেশি পাচ্ছেন তুলনামূলক সচ্ছলরা।
গুদামে সার আছে, তাহলে মাঠে নেই কেন?
এবার মৌসুমের ছবিটা দেখি। সরকারি দামে ইউরিয়া আর টিএসপির প্রতি কেজি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা, এমওপি ২০ টাকা, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা যথাক্রমে ১ হাজার ৩৫০, ১ হাজার ৩৫০ আর ১ হাজার ৫০ টাকা। মাঠের খবর বলছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রাজশাহীতে টিএসপির বস্তা বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ হাজার টাকায়, ডিএপি অন্তত ১ হাজার ৬০০ টাকায়, আর ইউরিয়ার জন্য কৃষকরা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫৮০ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। কৃষি সচিব বলেছেন কার্যত কোনো সংকট নেই, একটি অংশ কৃত্রিমভাবে ঘটনা ঘটাচ্ছে। সংসদে জানানো হয়েছে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন, আর প্রস্তুত সরবরাহ ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন, মানে প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন বাড়তি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে সংকটের কারণ ধরা পড়েছে বিতরণ ব্যবস্থায়: ২৭ আগস্ট নতুন ডিলার নীতি জারি হয়েছে ঠিক আমনের চাহিদার চূড়ায়, আগে থেকেই ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পদ ফাঁকা ছিল, আর জুলাই ও আগস্টে ডিলাররা বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার গুদাম থেকে তুলেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, কিছু ডিলার ইচ্ছা করেই কম তুলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। ২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতে মোট প্রায় ৩৮ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা হয়েছে, জব্দ হয়েছে ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার, আর চারজনের কারাদণ্ড হয়েছে।
‘প্রস্তুত সরবরাহ’ আর গুদামের মজুত কি এক জিনিস?
এখানে এসে আমি একটা পার্থক্যে আটকে যাই। সংসদে বলা হয়েছে ‘প্রস্তুত সরবরাহ’, আর ওই শব্দে ঠিক কী কী ধরা হয়েছে, গুদামে থাকা মজুত, চুক্তি হওয়া আমদানি, না চলতি উৎপাদন, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে আমি পরিষ্কার জানতে পারিনি। অন্য দিকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বিএডিসির মোট মজুত ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার টন, আর ৩ সেপ্টেম্বর ডিএপির মজুত ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার টন, যেখানে অক্টোবরের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন। আগস্টের শেষ দিকে দ্য ডেইলি নিউ নেশনের প্রতিবেদনে ইউরিয়ার মজুত ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন, রবি মৌসুমের আনুমানিক চাহিদা ১৩ লাখ ২৬ হাজার টনের বিপরীতে, আর ডিএপির মজুত ৩ লাখ ৫২ হাজার টন, চাহিদা ৯ লাখ ৮৮ হাজার টনের বিপরীতে। এই সংখ্যাগুলোর সময়সীমা আর সারের ধরন সরকারের হিসাবের সঙ্গে হুবহু মেলে না, তাই একটাকে দিয়ে অন্যটাকে খণ্ডন করা যাবে না। কিন্তু একটা কথা বোঝা যায়: উদ্বৃত্ত কাগজে আছে নাকি জেলার গুদামে, সেই প্রশ্নের উত্তর জেলাভিত্তিক মজুত ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ ছাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকও একই জায়গায় আঙুল তুলেছে। তাদের ভাষ্যে কাগজভিত্তিক ও দুর্বল নজরদারির বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ কমলে বা দাম বাড়লে কর্তৃপক্ষের হাতে বাস্তব সময়ের তথ্য থাকে না।
বস্তার ভেতরের হিসাব: কে কত টাকা পায়?
আমি নিজে একটা হিসাব কষে দেখেছি। ১ অক্টোবর মন্ত্রিসভা কমিটি যেসব আমদানি অনুমোদন করেছে, সেগুলোর টাকার অঙ্ককে টনে ভাগ করলে প্রতি কেজি আমদানি খরচ দাঁড়ায় ইউরিয়ায় প্রায় ৫৪ থেকে ৬৭ টাকা, টিএসপিতে প্রায় ৮৩ টাকা আর ডিএপিতে প্রায় ১০৮ টাকা। কৃষক দেন ইউরিয়া ও টিএসপিতে ২৭ টাকা, ডিএপিতে ২১ টাকা। মানে শুধু আমদানি মূল্য ধরলেই সরকার ইউরিয়ায় খরচের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ, টিএসপিতে প্রায় ৬৭ শতাংশ আর ডিএপিতে প্রায় ৮১ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। বস্তার হিসাবে ৫০ কেজির ডিএপিতে ভর্তুকি প্রায় ৪ হাজার ৩৭২ টাকা, টিএসপিতে প্রায় ২ হাজার ৭৭৮ টাকা, আর সৌদির সাবিকের চালান ধরলে ইউরিয়ায় প্রায় ১ হাজার ৫১১ টাকা। জাহাজ থেকে নামানো, বস্তাভরা, পরিবহন, সুদ আর ডিলারের কমিশন ধরলে ভর্তুকি আরও বাড়বে, তাই এই হিসাবকে আমি ন্যূনতম ধরছি। এবার সংকটের জায়গাগুলো দেখা যাক: যে দুই সারের ভর্তুকি সবচেয়ে ভারী, সেই টিএসপি ও ডিএপি নিয়েই মাঠের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এটা প্রমাণ নয়, একটা প্যাটার্ন, কিন্তু অর্থনীতির সরল সূত্র এখানে মিলে যায়: বাজারদরের অনেক নিচে দাম বেঁধে দিলে চাহিদা বাড়ে, সরবরাহে টান পড়ে, আর কালোবাজার জন্ম নেয়। কালোবাজারের ২ হাজার টাকার টিএসপির বস্তাও সরকারের আমদানি খরচ ৪ হাজার ১২৮ টাকার অর্ধেকেরও কম। ডিলারের আইনি কমিশন কেজিতে ২ টাকা, মানে বস্তায় ১০০ টাকা, অথচ ওই টিএসপির বস্তায় বাড়তি দাম ৬৫০ টাকা, কমিশনের সাড়ে ছয় গুণ। যাঁর হাতে বরাদ্দ আছে, তাঁর কাছে সরকারি দামে বেচার চেয়ে দেরি করা বা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার লোভ তাই বাস্তব। বিশ্বব্যাংকের আগের তথ্যও একই দিকে ইঙ্গিত দেয়: ২০১৯ সালের পারিবারিক জরিপে কৃষক গড়ে সরকারি দামের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি দিয়েছেন, বাড়তি সবচেয়ে বেশি টিএসপি ও ডিএপিতে, ফলে ভর্তুকির যে অংশ কাগজে ৩৮ শতাংশ, বাস্তবে তা নেমেছে ৩২ শতাংশে।
দাম বেঁধে দেওয়ার তত্ত্ব আর কৃষি খাতের খরচ
দামের এই ফাঁকটা কৃষি খাতকে তিন দিক থেকে ভোগাচ্ছে। প্রথম দিক সার ব্যবহারের ধরন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সুষম মিশ্রণ দেন; প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ফসফরাস বেশি দেন, আর প্রায় ৯০ শতাংশ সালফার কম। সুষম ব্যবহারে আমন ধানের ফলন প্রায় ৬৫ শতাংশ আর বোরোর প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়তে পারে, আর বেশি দিলে খরচ বাড়ে, ফলন নয়। অর্থাৎ ভর্তুকির একটা অংশ এমন সারের পেছনে যাচ্ছে, যা ফলন বাড়াচ্ছে না। দ্বিতীয় দিক সুযোগ খরচ, মানে এই টাকা অন্য কাজে লাগালে কী হতো। খাদ্য ও কৃষি খাতের মোট ব্যয়ের ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ যায় ভর্তুকিতে, আর কৃষি গবেষণা পায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১ টাকা গবেষণায় প্রায় ১০ টাকা ভর্তুকিতে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ এখন ভর্তুকি, ২০১৯ অর্থবছরে যা ছিল ৬৩ শতাংশ। গত পাঁচ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকিতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৪ কোটি টাকা, তার আগের পাঁচ বছরের তিন গুণের বেশি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী। তৃতীয় দিক আমদানির ঝুঁকি। ইউরিয়ার চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়, আর বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ভর্তুকি খরচের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানির কারণে; আমদানি করা ইউরিয়ার খরচ দেশে তৈরির প্রায় দ্বিগুণ হলেও গ্যাস সংকটে দেশি কারখানা চলছে অর্ধেক বা তারও কম। সেপ্টেম্বরে সংসদে সরকার জানিয়েছে, গ্যাস ও কাঁচামালের অভাবে কয়েকটি কারখানা বন্ধ, ঘোড়াশাল পলাশ ও শাহজালাল স্বাভাবিক চলছে, আর চট্টগ্রাম ইউরিয়া শিগগির চালু হবে বলে আশা। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আমদানি পথ অনিশ্চিত, আর আইএমএফ আসন্ন ঋণ কর্মসূচিতে সার ভর্তুকি সংস্কারকে প্রধান শর্ত করবে বলে ডেইলি স্টার জানিয়েছে। মানে সরকার এখন এমন এক সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে, যার একদিকে বাজেটের চাপ, অন্যদিকে কৃষকের ফলন।
অন্য দেশের গল্প আর আমাদের কৃষক কার্ড
বিশ্বব্যাংক অন্য ধান উৎপাদনকারী দেশের উদাহরণ টেনেছে। ভারত ভর্তুকির টাকা ছাড়ে যাচাই করা কৃষকের কাছে বিক্রি নিশ্চিত হলে, বায়োমেট্রিক যন্ত্রের মাধ্যমে, আর ই-উর্বরক ড্যাশবোর্ডে মজুত ও বিক্রি প্রায় বাস্তব সময়ে দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ায় কৃষক গ্রুপ নিজেরাই বার্ষিক চাহিদা পরিকল্পনা বানায়, আর থাইল্যান্ডে রসিদভিত্তিক ভাউচার চালু আছে। বাংলাদেশে উল্টো ছবি: বিক্রি যাচাইয়ের সঙ্গে ভর্তুকি ছাড়ের কোনো যোগ নেই। এর মধ্যেই সরকার বাংলা নববর্ষে কৃষক কার্ড চালু করেছে, আর চলতি অর্থবছরে ১০০ উপজেলার ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কার্ড দিতে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা রেখেছে। দিকটা ঠিক, তবে আমার হিসাবে এই বরাদ্দ সারের ভর্তুকির (প্রায় ২৮ হাজার কোটি) মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, আর কার্ডের মাধ্যমে দশটি সেবা দেওয়ার কথা, শুধু সার নয়। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব, কার্ডের সঙ্গে ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধন যুক্ত করে বর্গাচাষি ও ভাগচাষিসহ প্রকৃত চাষিদের চিহ্নিত করা, ইলেকট্রনিক ভাউচারে সহায়তা দেওয়া, আর সারের সরকারি দাম ধাপে ধাপে, আগে ঘোষণা দিয়ে বাড়ানো, কারণ হঠাৎ বাড়ালে নগদ সংকটে থাকা ছোট চাষি সার কম দেবেন, যার ধাক্কা ফলন আর খাদ্যের দামে ফিরে আসবে। তবে ভারতের অভিজ্ঞতাও একটা সতর্কতা: ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকলেও আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে ভর্তুকির বিল ফুলে ওঠে, সরকারি সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির সার মন্ত্রণালয় এই বছরের ১ লাখ ৭১ হাজার কোটি রুপির বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার অনুরোধ করেছে।
তাহলে কী দাঁড়াল, আর এখন কী করা যায়?
সব হিসাব মিলিয়ে আমার তিনটি সিদ্ধান্ত। এক, সংকটের কারণ একটি নয়, তিনটি স্তর। নকশার স্তরে ভর্তুকি পরিমাণভিত্তিক, আর দাম বাজারের এত নিচে বাঁধা যে ফাঁকটা ডিএপিতে কৃষকের দেওয়া দামের চার গুণ, টিএসপিতে দুই গুণ, ইউরিয়ায় এক থেকে দেড় গুণ; তাই ডিলারের কমিশন কেজিতে ২ টাকা আর বাজারে বস্তায় কয়েকশ টাকা বাড়তি দাম থাকলে সরবরাহে টান পড়বেই। ব্যবস্থাপনার স্তরে ডিলার নীতি বদলের সময়টা ভুল ছিল, আর বাস্তব সময়ের মজুত ও বিক্রির তথ্য নেই। বাইরের স্তরে আমদানি আর গ্যাসের ঝুঁকি। দুই, ‘অর্ধেক বড় কৃষকের’ কথাটা জমির হিসাবে সত্য, কিন্তু সমাধান ভর্তুকি হঠাৎ কমানো নয়, কারণ আয়ের অনুপাতে এর গুরুত্ব গরিবের কাছে ধনীর দশ গুণ। তিন, করণীয় তিন মেয়াদে সাজানো যায়, যদিও এই সুপারিশগুলো আমার নিজের বিবেচনা। এখনই: রবি ও বোরোর আগে ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিবাদ মিটিয়ে সরবরাহ স্থির করা, জেলাভিত্তিক গুদাম মজুত ও বিক্রির তথ্য সাপ্তাহিক প্রকাশ করা, আর ডিলারদের কমিশন বাড়ানোর সময়সীমা এগিয়ে আনা, কারণ সরকারের ঘোষিত বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বাড়তি কমিশন কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই ২০২৭ থেকে, আর ডিলারদের দাবি ২০০ টাকা। এক থেকে তিন বছরে: কৃষক কার্ডে বর্গাচাষিসহ নিবন্ধন, বিক্রি যাচাইয়ের যন্ত্রের সঙ্গে ভর্তুকি ছাড় বেঁধে দেওয়া, শুরু হোক সবচেয়ে বড় ফাঁকের ডিএপি ও টিএসপি দিয়ে। দীর্ঘ মেয়াদে: ছোট ধাপে আগাম ঘোষণা দিয়ে দাম বাড়ানো, সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকের জন্য ইলেকট্রনিক ভাউচার, আর ভর্তুকি থেকে বাঁচা অর্থ গবেষণা, মাটি পরীক্ষা, সম্প্রসারণ আর দেশি উৎপাদনের জন্য গ্যাস নিশ্চিত করায় সরানো। শেষ কথা একটাই: ভর্তুকির প্রশ্ন আসলে ছোট কৃষকের হাতে পৌঁছনোর প্রশ্ন, তাই ‘কত টাকা দিলাম’ নয়, ‘কার হাতে, কখন, কত দামে পৌঁছল’, এই হিসাবটাই এখন সরকারের রিপোর্ট কার্ডে থাকা উচিত।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

