বিদেশি বিনিয়োগের নামে জাতীয় স্বার্থ, শ্রমিকের অধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
বন্দর কেবল পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা নয়; এটি অর্থনীতির প্রবেশদ্বার, রপ্তানির প্রাণপ্রবাহ ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পরিচালনা কে করবে, কী শর্তে করবে এবং সুফল কার ঘরে পৌঁছাবে, এসব প্রশ্নকে নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বলে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকার বলছে, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই থাকবে; বিদেশি প্রতিষ্ঠান শুধু পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু মালিকানা অক্ষুণ্ন থাকা আর পরিচালনাগত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের কার্যকর কর্তৃত্ব বজায় থাকা এক বিষয় নয়।
দক্ষতার প্রশ্ন, নাকি নির্ভরশীলতার নতুন অধ্যায়?
বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা করলেই কেউ দেশপ্রেমিক হন না, আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলেই উন্নয়ন আসে, এমনও নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কোন ব্যবস্থায় দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সবচেয়ে ভালো সুরক্ষিত থাকে।
আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত পণ্য খালাস বন্দরের জন্য জরুরি। খালাসে দীর্ঘসূত্রতা বাড়লে আমদানিকারকের ব্যয় বাড়ে, রপ্তানির সময়সূচি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়, আর শেষ চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দেওয়াই একমাত্র পথ নয়; নিজস্ব সংস্কার, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির মাধ্যমেও আধুনিকায়ন সম্ভব।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে তারা কী প্রযুক্তি আনবে, কত বিনিয়োগ করবে, কত দিনে সেবার মান বাড়াবে, স্থানীয় কর্মীদের কতটা দক্ষ করবে, এসবের সুস্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে। শুধু আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি যথেষ্ট নয়।
সার্বভৌমত্ব শুধু মানচিত্রের সীমানা নয়
বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ: গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কতটা স্বাধীনভাবে চালানো যায়, সংকটে সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর করা যায়, কৌশলগত সম্পদের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলেই সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, তথ্যপ্রবাহ, নিরাপত্তা, শুল্কসংশ্লিষ্ট সমন্বয় বা চুক্তি বাতিলের শর্তে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হলে উদ্বেগের কারণ আছে। তাই শুধু মালিকানার নিশ্চয়তা যথেষ্ট নয়; চুক্তির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা-সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয়ও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
চুক্তি গোপন থাকলে আস্থা কীভাবে তৈরি হবে?
রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে স্বচ্ছতা আনুষ্ঠানিকতা নয়, জনস্বার্থ রক্ষার প্রথম শর্ত। জনগণের জানার অধিকার আছে:
●চুক্তির আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগি ও পরিচালন ব্যয়
●বিনিয়োগের পরিমাণ ও সেবার মানদণ্ড
●ব্যর্থতার জরিমানা ও চুক্তি পুনর্বিবেচনার শর্ত
সরকার চুক্তিকে লাভজনক মনে করলে সেই লাভের হিসাব, অর্থাৎ আয়, দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় সাশ্রয় ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা, প্রকাশ করতে আপত্তি থাকার কথা নয়। বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখেও স্বাধীন নিরীক্ষা ও সংসদীয় তদারকি থাকা জরুরি। স্বচ্ছতা মানে সবকিছু নির্বিচারে প্রকাশ নয়, বরং স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের কার্যকর সুযোগ। সরকারের দাবি আর যাচাইযোগ্য তথ্য এক নয়; আস্থা গড়ে ওঠে তথ্য, যুক্তি ও জবাবদিহিতে, শুধু আশ্বাসে নয়।
শ্রমিকদের উদ্বেগ অবজ্ঞা নয়, সমাধান করতে হবে
আধুনিকায়নের নামে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, চাকরির শর্ত বা সংগঠিত হওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার মূল্য দিতে হবে দেশকেই। শ্রমিকদের প্রতিটি আপত্তি যথার্থ ধরে নেওয়া যেমন জরুরি নয়, তেমনি পরিবর্তনের বিরোধিতাকে অগ্রগতিবিরোধী বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল নয়। দরকার তথ্যভিত্তিক আলোচনা, অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা ও প্রশিক্ষণ।
বন্দরে শ্রমিক অসন্তোষ সরাসরি আমদানি-রপ্তানি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। তাই শ্রমিক প্রতিনিধি, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী ও সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।
উন্নয়নের চুক্তি হোক সক্ষমতা তৈরির হাতিয়ার
বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, স্থায়ী নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরিমাপযোগ্য দক্ষতা-সূচক থাকা উচিত, যাতে মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ আরও দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ জন্য পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি:
●চুক্তির জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট শর্ত যথাসম্ভব প্রকাশ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে অর্থনৈতিক ও আইনি মূল্যায়ন।
●বিনিয়োগ, খালাসের সময়, সেবার মান, রাজস্ব আয় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন।
●জাতীয় নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিকার নিয়ে কার্যকর আইনি নিশ্চয়তা।
●শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক শর্ত এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
●স্বাধীন মূল্যায়ন, নিরীক্ষা ও সংসদীয় তদারকি শক্তিশালী করা।
শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে তো বাংলাদেশ?
বিতর্ককে বিদেশিবিরোধিতা বনাম উন্নয়নপন্থার সরল বিভাজনে আটকে রাখলে আসল প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক দক্ষতা কাজে লাগতে পারে, কিন্তু চুক্তির সাফল্য কত দ্রুত কনটেইনার ওঠানামা করল বা কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পেল, তা দিয়ে মাপা যাবে না। মাপতে হবে বাণিজ্যিক ব্যয় কতটা কমল, রাষ্ট্রের আয় কতটা বাড়ল, শ্রমিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা বাড়ল এবং দেশ নিজের অবকাঠামো চালাতে কতটা স্বনির্ভর হলো।
বন্দর সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি অর্থনীতির শিরা-উপশিরার সঙ্গে যুক্ত কৌশলগত সম্পদ। তাই সিদ্ধান্ত হতে হবে সর্বোচ্চ সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে। মালিকানা বাংলাদেশের হাতে থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; আয়, সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ওপর কার্যকর কর্তৃত্বও নিশ্চিত করতে হয়। উন্নয়ন তখনই সার্থক, যখন বিদেশি দক্ষতা দেশের সক্ষমতা বাড়ায়, নতুন নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয় না।

