পুঁজিবাজারে কারসাজি: পুরোনো ক্ষত, নতুন প্রশ্ন
একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী যে শেয়ার কিনেছিলেন, কয়েক সপ্তাহে তার দাম হঠাৎ দ্বিগুণ হলো। তারপর এক সপ্তাহে তা অর্ধেকে নেমে এল। তিনি কিনেছিলেন উত্থানের মাঝপথে। যাঁরা কারসাজি করেছিলেন, তাঁরা তখন বেরিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এই গল্প নতুন নয়। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ধসের পর নানা তদন্ত হয়েছে, সুপারিশ হয়েছে, কিন্তু অবস্থা বারবার একই জায়গায় ফিরে গেছে।
১৯৯৩ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তদারকি করে। প্রশ্ন হলো, নিয়ন্ত্রকের হাতে আইন থাকার পরও আস্থা ফিরছে না কেন? এর কারণ প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, স্বাধীনতা ও শাস্তির নিশ্চয়তার অভাবে সেই ক্ষমতা বাজারে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
বিএসইসির ক্ষমতা
বিএসইসি আইন ও বিধিমালার অধীনে তদন্ত চালাতে পারে, জরিমানা করতে পারে, লাইসেন্স বাতিল করতে পারে এবং নির্দিষ্ট শেয়ারের লেনদেন বন্ধ রাখতে পারে। আইপিও অনুমোদন, মার্জিন ঋণের নীতি, ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকের তদারকি এবং দামের ওঠানামার সীমা নির্ধারণও বিএসইসিইয়ের এখতিয়ারে হয়।
৪ জুন ২০২৬ তারিখে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। তাঁর পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরকার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খানকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। নিয়োগ চার বছরের জন্য, এবং অন্য সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়ার শর্তে। নতুন চেয়ারম্যান কারসাজির বিরুদ্ধে রিয়েলটাইম ব্যবস্থা এবং ভালো কোম্পানি আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন কাঠামোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ইউএনবি জানায়, বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেন দিনের শেষে ১ হাজার ৩৫১ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা ২০২৬ সালের একদিনের সর্বোচ্চ লেনদেন।
বাজারের বাস্তবতা
জরিমানার সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনায় মোট প্রায় ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শুধু বেক্সিমকোর শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় জরিমানা ৪২৮ কোটি টাকা। সাবেক কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁর ছেলেকে আজীবন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এমনকি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে কারসাজির অভিযোগে সাকিব আল হাসানকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রথমত জরিমানার অঙ্কের তুলনায় কারসাজিতে অর্জিত মুনাফা কত ছিল? জরিমানা মুনাফার চেয়ে কম হলে তা ব্যয় হিসেবেই ধরা পড়ে, শাস্তি হিসেবে নয়। দ্বিতীয়ত, জরিমানা আদায় হয়েছে কতটা? এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় আছে। এসব জরিমানার বেশির ভাগই আগের কমিশনের আমলের, এখন নতুন কমিশন সেগুলো নিয়ে কথা বলছে। এই ধারাবাহিকতা কি টিকবে, নাকি প্রতিটি কমিশন আগেরটির বিচার করবে? এটি স্বাধীনতার প্রশ্নও বটে।
১৯৯৬ আর ২০১০ সালের ধসের কথা শেয়ারবাজারের মানুষ ভোলেননি। ২০১০ সালের ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি হয়েছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে (বিডিনিউজ২৪) জানিয়েছিল, ওই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, সুপারিশও কার্যকর হয়নি। সেই সময় নতুন তদন্ত কমিটির এক সদস্য আরও বলেছিলেন, আগের প্রতিবেদনে দুজনকে পুঁজিবাজার থেকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
ফ্লোর প্রাইস: সংকটের সমাধান, নাকি সাময়িক স্থগিতাদেশ?
ফ্লোর প্রাইস এই পরীক্ষার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের বছরে দরপতন ঠেকাতে বিএসইসি এটি আরোপ করে। প্রত্যাহার শুরু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে, ধাপে ধাপে। তবে প্রক্রিয়াটি এলোমেলো ছিল। এক পর্যায়ে তুলে নেওয়া হয়, আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
২০২৬ সালের জুনে এসে শেষ দুটি কোম্পানি, ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকো, থেকেও তা সরানো হয়। কমিশন বলেছে, কৃত্রিমভাবে ফ্লোর প্রাইস ধরে রাখা বাজারের স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। এর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে এক দিনেই দুই কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। এই ঘটনা দুটি কথা বলে। ফ্লোর প্রাইস স্থায়ী দর পতন ঠেকায়নি, শুধু পিছিয়ে দিয়েছে। আর যে সূচক কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা হয়েছিল, তা প্রকৃত বাজারচিত্র আড়াল করেছে। ব্রোকারদের সংগঠনও ফ্লোর প্রাইসের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রত্যাহার দাবি করেছিল।
কেন প্রয়োগ দুর্বল
প্রথম কারণ স্বাধীনতা। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ সরকার করে এবং ২০২৬ সালের জুনের ঘটনা দেখায় সরকার বদলালে পুরো কমিশন একসঙ্গে বদলে যেতে পারে। চার বছরের নির্ধারিত মেয়াদ কাগজে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু একসঙ্গে পদত্যাগের নজির বলে, বাস্তবে সেই সুরক্ষা কতটা দুর্বল।
দ্বিতীয় কারণ সক্ষমতা। কারসাজি ধরতে হলে একাধিক অ্যাকাউন্টের লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করতে হয়, যার জন্য প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দরকার। রিয়েলটাইম নজরদারির ঘোষণা এই ঘাটতিই স্বীকার করে।
তৃতীয় কারণ আইনি প্রক্রিয়া। জরিমানার আদেশ হলেও আপিল ও আদালতে মামলা বছরের পর বছর চলে। দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে শাস্তি তার প্রতিরোধী শক্তি হারায়।
চতুর্থ কারণ স্বার্থের দ্বন্দ্ব। শামসুদ্দিন আহমেদের ঘটনাই দেখায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরের ব্যক্তিও কারসাজিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। প্রভাবশালী পরিচালক, ব্রোকার ও ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়ন্ত্রকের দূরত্ব রাখার কাঠামো তাই জরুরি।
ভারত ও বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র
ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবির (SEBI) আদেশের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল সিকিউরিটিজ আপিলেট ট্রাইব্যুনাল (SAT) রয়েছে। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য বিনিয়োগকারীরা একটি পৃথক আইনি ফোরাম পান। বাংলাদেশে ধারণাটি নতুন নয়, কিন্তু কার্যকর হয়নি।
বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠ
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মতে, শেয়ারবাজারে কারসাজির কারণে বিনিয়োগকারীরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পেয়েছেন কি না এবং বিএসইসির পদক্ষেপে কতটা আস্থা রাখেন, তা জানতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, কারসাজির বিরুদ্ধে শাস্তির কার্যকারিতা, আইনের প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে হবে।
আইনের কঠোরতা নয়, প্রয়োগের কার্যকারিতাই মূল
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শুধু কঠোর আইন বা বড় অঙ্কের জরিমানা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, শাস্তি কার্যকর করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিএসইসির কার্যকারিতা মূল্যায়নের মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত আইন ও বিধানের সংখ্যা নয়, বরং অনিয়ম প্রতিরোধ, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশনের বাস্তব সাফল্য।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

