অক্টোবরের শুরুতে টিসিবির হিসাবে, প্রতি ডজন ডিমের দাম উঠেছিল ১৬৫ টাকায়। কিছু খুচরা দোকানে একই ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১৭৫ টাকায়ও। সরকারি হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিমের দাম বেড়েছিল সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। শুধু ডিম নয়, সামগ্রিক বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ স্পষ্ট। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, এ বছর একই পণ্য কিনতে খরচ হচ্ছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৭.০২ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৭.২২ শতাংশ। বাজারে দাম বাড়লেই অভিযোগের আঙুল ওঠে সিন্ডিকেটের দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত হুঁশিয়ারি আর ব্যবস্থা নেওয়ার পরও একই পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি গত কয়েক বছরের ডিম ও চালের বাজারের তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনের নথিও পর্যালোচনা করেছি। তাতে দেখা গেছে, সমস্যাটিকে শুধু ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি’ বলে ব্যাখ্যা করলে এর পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
তিন পয়সার খরচ, পৌনে তিন টাকার দাম
২০২২ সালের আগস্টের ঘটনা দিয়ে শুরু করি, কারণ ওই ঘটনার সবচেয়ে ভালো নথি আছে। জ্বালানির দাম বাড়ার পর ডিমের দাম লাফিয়ে উঠেছিল। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) প্রতিবেদনে অনুযায়ী, তেলের দাম বাড়ায় প্রতিটি ডিমের পরিবহন খরচ বেড়েছিল মাত্র ৩ থেকে ৪ পয়সা। অথচ ৯ থেকে ১৩ আগস্ট পাইকারদের লাভ ডিমপ্রতি ২ টাকা ৭০ পয়সায় উঠেছিলো, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে তা থাকে ১৫ থেকে ২০ পয়সা। ওই প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ ছিল, ডিম ব্যবসায়ী সমিতিগুলো মোবাইল ফোনে দাম ঠিক করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, অভিযান আর আমদানির ইঙ্গিতের দুই তিন দিনের মধ্যেই দাম নামতে শুরু করে, এক সপ্তাহের মধ্যে আগের জায়গায় ফেরে। এক সপ্তাহে ডিমের সরবরাহ নিশ্চয়ই বদলায়নি, বদলেছে কেবল ভয়। অভিযুক্ত পক্ষ অবশ্য অভিযোগ মানেনি। কাজী ফার্মসের এক পরিচালক বলেছিলেন, বড় কোম্পানিগুলো মিলে দেশের মোট ডিমের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ বিক্রি করে, তাই দাম বাড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এবার ২০২৬ সালে ছবিটা অদ্ভুতভাবে মেলে। মিরসরাইয়ের এক খামারি আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, তাঁর ডিম উৎপাদনে খরচ ১১ টাকা, পাইকারিতে বেচেছেন সাড়ে ১০ টাকায়, অথচ খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকায়। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর ক্যাবের সভাপতি অভিযোগ করেছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে দাম এসএমএসে ঠিক হয়। এগুলো এখনো অভিযোগ, কোনো রায়ে প্রমাণিত নয়। তবে অর্থনীতিতে একটা পরিচিত সূত্র আছে, যার নাম “রকেট আর পালক”। কাঁচামালের খরচ বাড়লে দাম রকেটের মতো ওঠে, কমলে পালকের মতো ধীরে নামে। ১৯৯১ সালে ব্যাকনের গবেষণার পর এটি বহু বাজারে দেখা গেছে, আর গবেষকেরা একে স্থানীয় বাজারে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার সংকেত হিসেবে দেখেন। এটি সিন্ডিকেটের প্রমাণ নয়, তবে কোথায় তদন্ত করতে হবে তার একটা দিকনির্দেশনা। সম্প্রতি ২০ সেপ্টেম্বর রাতে চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, কাজেই এই পরীক্ষা আবার সামনে আসছে।
যে আইনে “সিন্ডিকেট” শব্দটাই নেই
এবার আইনের কথা। আমরা যাকে সিন্ডিকেট বলি, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ তাকে বলে কার্টেল। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী আইনে “সিন্ডিকেট” শব্দটিই নেই। আইনের ১৫ ধারায় উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, মজুত বা সংগ্রহ নিয়ে এমন যোগসাজশ নিষিদ্ধ, যা প্রতিযোগিতার ক্ষতি করে বা একচেটিয়া বাজার তৈরি করে। আইনের সংজ্ঞায় সুস্পষ্ট চুক্তির পাশাপাশি অঘোষিত বা ইঙ্গিতে হওয়া সমঝোতাও ধরা হয়েছে। দোষ প্রমাণিত হলে কমিশন গত তিন বছরের গড় বিক্রির ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। এই আইন নিয়ে তাই আমার প্রথম পর্যবেক্ষণ, আইন একেবারে ফাঁপা নয়। আসল সমস্যা প্রমাণ জোগাড়ে। ফোনে বা এসএমএসে হওয়া সমঝোতা দোকানে গিয়ে ধরা যায় না। আবার এক পক্ষ বলে, হাজার হাজার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার দেশে সিন্ডিকেট করা বাস্তবে সম্ভব নয়, আসল সমস্যা বাজারের কেন্দ্রীভবন। অর্থাৎ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা আমদানিকারকের হাতে বাজারের চাবি। এই দুই ব্যাখ্যার কোনটি কোন পণ্যে খাটে, তা বলতে পারে কেবল তথ্য ও তদন্ত। আর এই জায়গাতেই আমরা বারবার হোঁচট খাই।
শীর্ষ পর্যায়ের বিচার ধীর
প্রতিযোগিতা কমিশন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে চাল, আটা, ডিম, পোলট্রি ও প্রসাধনীর কৃত্রিম সংকটের অভিযোগে ৪৪টি মামলা করেছিল। ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর ব্রয়লার মুরগির দামবৃদ্ধির দুটি মামলায় কাজী ফার্মসকে ৫ কোটি এবং সুগুনা ফুডসকে ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিলো। দুই প্রতিষ্ঠানই আপিলের কথা জানায়, আর আপিল যায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। ৪৪টি মামলার বাকিগুলোর পরিণতির কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব আমি যাচাইযোগ্য সূত্রে পাইনি। সেটা জানার সবচেয়ে সহজ পথ কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন। আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান বলছে, আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী অর্থবছর শেষের ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। অথচ ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ওয়েবসাইটে সর্বশেষ প্রতিবেদন ২০২২ থেকে ২৩ অর্থবছরের, যা প্রকাশ হয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, প্রতিবেদন প্রক্রিয়াধীন, দ্রুত প্রকাশ হবে। তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন, কমিশনের কাজ আধা বিচারিক, দুই পক্ষের শুনানি নিয়ে রায় দিতে হয়, ভোক্তা অধিদপ্তরের মতো তাৎক্ষণিক জরিমানা করা যায় না। তাঁর কথা ঠিক। কিন্তু এর ফল হলো, বাজারে যে ধরপাকড় চোখে পড়ে সেটা প্রায় সবই খুচরা পর্যায়ের। যেমন আগস্টে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অভিযানে পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের বিচার ধীর, আর তার হিসাবও জনগণের সামনে আসছে না।
খামারের ডিম আর মাঠের চাল: টাকাটা আটকে যায় কোথায়
এবার পুরো সরবরাহব্যবস্থার দিকে তাকানো যাক। জুলাইয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, খামার বা কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চালের গড় দাম ছিল ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা। কিন্তু খুচরা বাজারে সেই চাল বিক্রি হয়েছে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। অর্থাৎ, উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসতে দাম বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ, প্রায় দ্বিগুণ। একই গবেষণায় দেখা যায়, ডালের দাম ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ, আলুর ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচের ১১৬ শতাংশ এবং বেগুনের ৭২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ডিমের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগির ২২ শতাংশ, গরুর মাংসের ১৩ শতাংশ এবং মাছের ১০ শতাংশ। তবে এই হিসাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সাত্তার মণ্ডল বলেছেন, গবেষণাটি পুরো বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়নি; এতে মাত্র পাঁচ মাসের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সিপিডি জানিয়েছে, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেও গবেষণার সংখ্যাগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বা উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে দাম অনেক বেড়ে যায়, যেমন চাল, ডাল ও বিভিন্ন সবজি, সেখানে সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী ধাপগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। আড়তদারি, মজুত, কমিশন এবং এক ব্যবসায়ীর হাত থেকে আরেক ব্যবসায়ীর কাছে পণ্য যাওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে কত খরচ যোগ হচ্ছে, তা জানা জরুরি। অন্যদিকে, ডিমের ক্ষেত্রে উৎপাদক ও খুচরা দামের ব্যবধান তুলনামূলক কম হলেও বাজারে এর দাম বারবার বাড়ছে। তাই শুধু খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; ডিম উৎপাদনের উপকরণ, বিশেষ করে বাচ্চা ও মুরগির খাদ্যের খরচ, এবং খামার থেকে ডিম বিক্রির দাম কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, সব পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একই কারণ কাজ করে না। তাই সব পণ্যের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা নিলেও সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
সমস্যার ধরন বুঝতে হলে আগে বাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, দেশে চাল ও গমের প্রকৃত বার্ষিক ভোগের নির্ভরযোগ্য হিসাবই নেই। মাছ ও হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে এসব শস্যের কতটা ব্যবহার হয়, সে সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে দেশে আসলে কত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, চাহিদা কত, ঘাটতি কোথায় এবং সরবরাহে কতটা সংকট রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন। এই তথ্যের ঘাটতিতে বাজারে পণ্যের সংকট সত্যিই তৈরি হয়েছে, নাকি সরবরাহ আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা আলাদা করে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে চালের বাজারে দামের পরিবর্তনও বিষয়টি নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। দ্য ডেইলি স্টার এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়ার পর মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১ টাকা। অথচ ঢাকার খুচরা বাজারে মিনিকেট চালের দাম ৭২ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ বা ৭৫ টাকায় উঠেছে। অবশ্য মাত্র এক সপ্তাহের তথ্য দিয়ে পুরো বাজার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে উৎপাদন, মিল, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পরিবর্তন কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কারণ, কোন পর্যায়ে কতটা খরচ যোগ হচ্ছে, আর কোথায় দামের বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে, সেই হিসাবই বাজারের প্রকৃত সমস্যাটি চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে।
জরিমানা বাড়লে কি ভয় বাড়ে?
এখানে আমি একটু ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখতে চাই। বাজারে কারসাজি বন্ধ করতে গেলেই আমরা সাধারণত বলি, ‘কঠোর আইন দরকার, শাস্তি বাড়াতে হবে।’ কিন্তু অপরাধ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শাস্তি কতটা কঠিন, তার চেয়ে অপরাধ করলে ধরা পড়ার আশঙ্কা কতটা, সেটি অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসে প্রকাশিত ড্যানিয়েল নাগিনের গবেষণার আলোচনাতেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। অপরাধী যদি মনে করেন, ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম, তাহলে শাস্তি কঠোর হলেও তা অপরাধ ঠেকাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
বাংলাদেশে মজুতদারি ও কালোবাজারি ঠেকানোর জন্য কোনো শাস্তির বিধান নেই, বিষয়টি এমন নয়। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনসহ কয়েকটি পুরোনো আইনে এ ধরনের অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দ্য ডেইলি স্টার–এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে মজুতদারির জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। এই ঘাটতি পূরণের উদ্দেশ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় নতুন ৪৩ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে পণ্য মজুত করলে দুই বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। খসড়াটি জনমত নেওয়ার জন্য ৩০ দিন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত থাকার কথা। তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত আইন হয়নি।
নতুন এই প্রস্তাব ইতিবাচক, কিন্তু আমার মতে, এটিকে সমস্যার অর্ধেক সমাধান বলা যায়। কারণ আইনে শাস্তির বিধান থাকলেই হবে না, অপরাধ শনাক্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে। শাস্তির ভয় তখনই কার্যকর হয়, যখন আইন ভাঙলে ধরা পড়ার বাস্তব আশঙ্কা থাকে। এ জায়গায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) কার্টেল বা প্রতিযোগিতাবিরোধী যোগসাজশকে প্রতিযোগিতা আইনের সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে। এ ধরনের যোগসাজশ শনাক্ত করতে সংস্থাটি ‘লিনিয়েন্সি’ বা দণ্ড লাঘবের ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর অর্থ হলো, কার্টেলের ভেতরে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তদন্তকারীদের কাছে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে নির্দিষ্ট শর্তে তার জরিমানা কমানো বা মওকুফ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, এ ধরনের অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটনে সক্রিয় তদন্তের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
মূল কথা হলো, মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে কার্যকর তদন্ত, অপরাধ শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে শুধু শাস্তি বাড়িয়ে বাজারের কারসাজি বন্ধ করা কঠিন।
সদিচ্ছা মনের সরাসরি মাপার উপায় নেই
অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সদিচ্ছা মনের বিষয়, তা সরাসরি মাপার উপায় নেই। বরং সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং সেই পদক্ষেপের ফল কী হচ্ছে, তা দেখেই অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা বোঝা সম্ভব। এই বিবেচনায় সরকারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। যেমন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী খসড়া তৈরি, ২৭ সেপ্টেম্বর ডিম ও পোলট্রি খাতের পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠক এবং টিসিবির প্রায় এক কোটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা। আবার ১ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। একই বৈঠকে টিসিবির প্রতিনিধি অনুরোধ করেছিলেন, নতুন বেতন কাঠামোর অজুহাতে যেন পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো না হয়। এই অনুরোধ থেকে অন্তত বোঝা যায়, বেতন বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়ানোর আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে।
তবে ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু ঘাটতিও স্পষ্ট। গত দুই বছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া, ৪৪টি মামলার পরিণতি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য না থাকা এবং ডিমের বাজার নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্যে অসংগতি, এসব বিষয় জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার, বাজারে প্রতিবার দাম বাড়লেই তার জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করা ঠিক নয়। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচও বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। আসল প্রশ্ন হলো, খরচ যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে এবং সেই বাড়তি দামের যৌক্তিক ব্যাখ্যা কী।
এ কারণে যেসব পদক্ষেপ আসলেই কার্যকর হতে পারে সেগুলো হলো, বাজারে বড় ধরনের খরচের পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব যাচাইয়ের জন্য একটি সহজ ও নিয়মিত পদ্ধতি চালু করা। জ্বালানির দাম বাড়া কিংবা নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার মতো ঘটনার পর এক সপ্তাহের মধ্যে পণ্যভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা যেতে পারে, যেখানে দেখানো হবে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কতটা বেড়েছে, আর বাজারে দাম বেড়েছে কতটা। ২০২২ সালে ডিমের ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ ডিমপ্রতি ৩ থেকে ৪ পয়সা বাড়লেও পাইকারি মুনাফা ২ টাকা ৭০ পয়সায় ওঠার যে হিসাব পাওয়া গিয়েছিল, সেটি এ ধরনের মূল্যায়নের একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ, মামলাগুলোর অগ্রগতি ও নিষ্পত্তির তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরে কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত শুধু কঠোর শাস্তির বিধান থাকাই যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগ হবে, অপরাধ শনাক্ত হবে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এই নিশ্চয়তাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে হলে শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালালে চলবে না; পণ্যের দাম নির্ধারণ, মজুত ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের যে ধাপগুলো সাধারণত আড়ালে থেকে যায়, সেখানেও নজর দিতে হবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

