তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে বন্ড গুদাম, শুল্ক প্রক্রিয়া ও রপ্তানি প্রণোদনা ব্যবস্থায় একগুচ্ছ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানি সহজ করা, কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং নতুন নতুন শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেওয়া।
বাজেটসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, সংস্কার পরিকল্পনায় বন্ড সুবিধা আরও বেশি রপ্তানিমুখী শিল্পে সম্প্রসারণ, নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং আমদানি করা পণ্য দ্রুত ছাড় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, জুতা, গয়না, হস্তশিল্পসহ অন্যান্য খাতের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৈরি পোশাকের বাইরে বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ
বন্ড গুদামব্যবস্থার আওতায় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন করতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এখন অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতেও একই ধরনের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বন্ডসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সব রপ্তানিমুখী খাত নির্ধারিত শর্তে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তৈরি পণ্য বিদেশে পাঠাতে পারে।
এই পরিবর্তন কার্যকর হলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগকারীদের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানির জন্য নতুন পণ্য তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পথও প্রসারিত হতে পারে।
নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ হবে প্রক্রিয়া
বন্ড সুবিধা ব্যবহারে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর অংশ হিসেবে শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং নিয়ম মেনে পরিচালিত তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বন্ড নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শতভাগ রপ্তানিমুখী চামড়াজাত পণ্য, জুতা, তোয়ালে, লিনেন ও গৃহসজ্জার বস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বন্ডের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত উৎপাদন ইউনিটগুলোও নির্দিষ্ট শর্তে ধারাবাহিক বন্ড সুবিধার আওতায় আসতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস কমিশনারেটের অধিক্ষেত্র আলাদা হলেও সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
বন্ড গুদামে একবারে কত পরিমাণ কাঁচামাল রাখা যাবে, সেই সীমা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঁচামাল মজুত ও ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে।
মালিকানা পরিবর্তন ও কাঁচামাল ব্যবহারে কমবে জটিলতা
বন্ড লাইসেন্সের মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে এ ধরনের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন মালিক—উভয়কেই কাস্টমস কর্মকর্তাদের সামনে সরাসরি সাক্ষাৎকারের জন্য উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্কারে এই শর্ত তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পণ্য চালানের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে কাঁচামাল ব্যবহারের অনুমতি সংগ্রহের সময়সীমা ৪৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ২৪ ঘণ্টা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেসব শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স নেই, তারাও যেন ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের বিপরীতে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে।
এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো কাগজপত্র ও অনুমোদনের জন্য অপেক্ষার সময় কমানো এবং উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
গয়না উৎপাদন ও রপ্তানিতে নতুন সুযোগ
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে গয়না উৎপাদন খাতকে বন্ড সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য নতুন প্রজ্ঞাপন জারির পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে নির্ধারিত স্বচ্ছতা ও বিধিবিধান মেনে গয়না তৈরির কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি এবং সেই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত গয়না রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গয়না উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে ১০ খাত
সংস্কার পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আরও ১০টি খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া। প্রস্তাবিত খাতগুলো হলো মোটরসাইকেল, দ্রুতগতির নৌযান, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, শিশুর ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, বাসনপত্র, তাঁবু, পুনর্ব্যবহৃত তুলার ব্যাগ এবং টেরি তোয়ালে।
এত দিন বন্ড লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি প্রশাসনিক চাপ তৈরি করতে পারে। নতুন সুযোগ চালু হলে এসব খাতের যোগ্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ করে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনায় আরও নমনীয়তা আসতে পারে।
অনুমোদিত অর্থনৈতিক পরিচালকদের সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ
অনুমোদিত অর্থনৈতিক পরিচালকের কর্মসূচির আওতায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচিতে পদ্ধতিভিত্তিক স্বমূল্যায়নের মাধ্যমে পণ্য ছাড়ের হার দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া এ সুবিধার জন্য আবেদন করার সময় নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তন কার্যকর হলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো কম সময় ও প্রশাসনিক ব্যয়ে কাস্টমস সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি করে, তাদের পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পরীক্ষার সুযোগ বাড়বে
আমদানি করা পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। এ সমস্যা কমাতে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণকারী বেসরকারি পরীক্ষাগারেও আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সরকারি পরীক্ষাগারের পাশাপাশি এ ধরনের বেসরকারি পরীক্ষাগারকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষার সময় কমতে পারে এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে। তবে পরীক্ষার মান, নির্ভরযোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কীটনাশক ও কৃষি রাসায়নিক উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে আরেকটি পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে চালানভিত্তিক সনদের পরিবর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বার্ষিক প্রাপ্যতাভিত্তিক সনদ নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বারবার সনদ সংগ্রহের প্রয়োজন কমতে পারে।
ছোট চালানে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জরিমানায় পরিবর্তন
ডাক বা কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে আসা ছোট ও কম মূল্যের চালানে অনিচ্ছাকৃত সাধারণ নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান তুলে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে ছোট চালানের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমতে পারে। তবে নিয়মভঙ্গের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে কতটা কাজে আসবে সংস্কার
বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ অবস্থায় নতুন পণ্য ও শিল্প খাতকে রপ্তানিতে যুক্ত করা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কাঁচামাল আমদানির বাধা কমানোর উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু নিয়ম পরিবর্তন করলেই রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিশ্চিত হবে না। নতুন শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে।
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নতুন ও বিদ্যমান রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়ীরা বাস্তবে কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, তার ওপর।

