প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে আছেন। আলোচনার তালিকায় আছে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিষয়টিও। সফরের ঠিক আগে, ১৭ অক্টোবর, দুই দেশ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ার একটি সহযোগিতা স্মারক সই করেছে। সেই স্মারকের আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে জাপান বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করবে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে টোকিওতে জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কথা বলেছিলেন। শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু অতীতের হিসাব বলছে, জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরেই বেগ পেতে হচ্ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কুড়ি বছরে অনুমোদিত নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে জাপানে গেছেন মাত্র ৫ হাজার ১৪ জন। আইএম জাপান নামের আলাদা কর্মসূচিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গেছেন আরও ৭০২ জন। তাই যে প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজে দেখা প্রয়োজন তা হলো, জাপান যখন ডাকছে, আমরা যেতে পারছি না কেন?
জাপানে কর্মীর সংকট বাড়ছে
জাপানের শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ তৈরির পেছনে বড় কারণ দেশটির বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। জাপানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি। চার কোটি বা তার বেশি জনসংখ্যার ৩৯টি দেশের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাঁচ বছরে জাপানের জনসংখ্যা ৩১ লাখের বেশি কমে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখে নেমেছে।
রিক্রুট ওয়ার্কস ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালে জাপানে কর্মীর ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় এক কোটি ১০ লাখে। তবে এই সংখ্যাকে বিদেশি কর্মীর চাহিদা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি জাপানের সামগ্রিক শ্রমঘাটতির পূর্বাভাস। জাইকার ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০৪০ সালে দেশটিতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৬৭ লাখ।
জাপানে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে এবং টানা ১৩ বছর ধরে নতুন রেকর্ড হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাপান সরকার ২০২৮ অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৩১ হাজার ৯০০ বিদেশি কর্মী নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৮ লাখ ৫ হাজার ৭০০ জন নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বা এসএসডব্লিউ কর্মসূচির আওতায় এবং ৪ লাখ ২৬ হাজার ২০০ জন নতুন ইএসডি কর্মসূচির আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই সংখ্যা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সীমা, নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়। নির্ধারিত সীমা পূরণ হলে নতুন নিয়োগ বন্ধ হতে পারে। এই হিসাবে পাঁচ বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার লক্ষ্যটি জাপানের মোট নির্ধারিত সীমার প্রায় ৮ শতাংশ।
নেপালের অগ্রগতি, আমাদের ধীরগতি
জাপানে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্রটি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। জাপানের অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষে সেখানে নেপালি নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ, আর বাংলাদেশির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৯৩৮। ২০২১ সালের শেষে নেপালি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৯৭ হাজার ১০৯। অর্থাৎ চার বছরে তা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২২ সালে জাপানে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ২২ হাজারের কিছু বেশি ছিল, যা পরবর্তী সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
কর্মীদের ধরন অনুযায়ী তুলনা করলে ব্যবধান আরও বড়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাপানে ভিয়েতনামের দুই লাখ ১২ হাজারের বেশি কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। একই সময়ে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৭৩৬।
ঢাকার একটি সেমিনারে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক নীতি উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, ২০২৪ সালে নেপাল থেকে ৫৬ হাজার ৭০৭ জন এবং বাংলাদেশ থেকে ৩ হাজার ৫৭৪ জন জাপানে গেছেন। তবে জাপানের অভিবাসন সংস্থার বছরশেষের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, নেপালের এই সংখ্যা ওই বছরে দেশটিতে থাকা নেপালি নাগরিকের মোট সংখ্যা বৃদ্ধির সমান। ২০২২ সালের ৪২ হাজার ২৮৪ জনের হিসাবেও একই ধরনের মিল রয়েছে। ফলে এই সংখ্যাগুলোকে শুধু নতুন কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যরাও থাকতে পারেন।
তবু সামগ্রিক প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসন গবেষক ডগলাস মেসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো দেশে আগে থেকে একটি অভিবাসী জনগোষ্ঠী গড়ে উঠলে পরবর্তী সময়ে সেখানে যাওয়া মানুষের খরচ, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা কমে। পরিচিতজনের কাছ থেকে তথ্য ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একবার অভিবাসনের প্রবাহ তৈরি হলে তা আরও বাড়তে পারে। নেপাল সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পেরেছে। বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
মান নিয়ে আমাদের অবস্থা নেপালের চেয়ে খারাপ নয়
অনেকের ধারণা, বাংলাদেশি কর্মীরা জাপানি ভাষার পরীক্ষায় ভালো করতে পারেন না। তবে জাপান ফাউন্ডেশনের জেএফটি বেসিক পরীক্ষার ফল এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। এসএসডব্লিউ কর্মসূচির ভাষাগত শর্ত পূরণে এই পরীক্ষা অথবা জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার এন ফোর স্তর অর্জন করতে হয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বাংলাদেশ থেকে এই পরীক্ষা দিয়েছিলেন ১৬৪ জন। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩২৫ জনে, যা প্রায় ১৪ গুণ বেশি। ওই সময় বাংলাদেশের পরীক্ষার্থীদের পাসের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ। নেপালে এই হার ছিল ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারের বিচারে বাংলাদেশ নেপালের চেয়ে পিছিয়ে ছিল না।
কিন্তু পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় ব্যবধান অনেক বড়। একই সময়ে নেপালে ১১ হাজার ৩৩০ জন এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ হাজার ৩৪১ জন পরীক্ষা দিয়েছেন। শুধু ভাষা পরীক্ষায় পাস করলেই অবশ্য জাপানে চাকরি নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজনীয় পেশাগত দক্ষতা অর্জন, দক্ষতা পরীক্ষা পাস এবং নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পাওয়াও জরুরি।
এখানেই বাংলাদেশের আরেকটি সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। জাপানের এসএসডব্লিউ সহায়তা ওয়েবসাইটে অক্টোবর ও নভেম্বরের পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচটি খাতে দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ ছিল। সেগুলো হলো পরিচর্যা, ভবন পরিষ্কার, নির্মাণ, মোটরযান পরিবহন ও কৃষি। ভিয়েতনামে এই সুযোগ ছিল নয়টি খাতে। গাড়ি মেরামত, হোটেল, কারখানা ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের জন্য বিদেশি দক্ষতা পরীক্ষার ব্যবস্থা ওই সময়সূচিতে ছিল না।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু কর্মীদের যোগ্যতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রার্থী তৈরি, পরীক্ষার সুযোগ এবং চাকরির ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। জাপানি সংস্থা জেপি মিরাই ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফরের পর জানিয়েছিল, জাপান থেকে চাকরির প্রস্তাব বাড়েনি। ছয় মাসের ভাষা শিক্ষা শেষ করেছেন বা এন ফোর পরীক্ষায় পাস করেছেন, এমন অনেকেই চাকরির অপেক্ষায় ছিলেন। অর্থাৎ প্রস্তুতি নেওয়ার পরও কাজ না পেলে প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে, কিন্তু চাকরি কোথায়
জাপানি ভাষা শেখানোর ব্যবস্থাতেও ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক নীতি উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক প্রশিক্ষক জাপানফেরত কর্মী, যাঁরা নিজের উদ্যোগে ভাষা শিখেছেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নেননি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখাও কঠিন। পাশাপাশি এন ফোর স্তরের ভাষা কোর্সের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
বিএমইটির মহাপরিচালক বলেছেন, জাপানি ভাষা শিখতে প্রায় ছয় মাস লাগে। এই পুরো সময় নিজের খরচ চালিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে কেউ কেউ মাঝপথে প্রশিক্ষণ ছেড়ে দেন। এ ক্ষেত্রে ভাতা বা ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কাগজে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা অবশ্য কম নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, ৫৩টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে জাপানি ভাষা শেখানো হয়, যার মধ্যে ১৫টিতে অনলাইনেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বেসরকারি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে দুই শতাধিক এবং অনুমোদিত নিয়োগকারী সংস্থা রয়েছে ৯৫টি। কিন্তু বিএমইটির একটি হিসাবে, এর আগে অনুমোদন পাওয়া ৯৬টি সংস্থার মধ্যে বছরে সক্রিয় ছিল মাত্র ৩০টি।
এই হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। প্রশিক্ষণকেন্দ্র কতটি, কতজন সনদ পেলেন, কিংবা কতটি নিয়োগকারী সংস্থা অনুমোদন পেল, শুধু এসব দিয়ে সাফল্য মাপা যায় না। আসল বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কতজন কর্মী চাকরি পেলেন এবং কতজন সেই চাকরিতে টিকে থাকতে পারলেন। ২০২৩ সালে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাপানফেরত একজন নিয়োগকারী বলেছিলেন, অনেক প্রার্থী দক্ষতা পরীক্ষায় বাদ পড়েন। যাঁরা পাস করেন, তাঁদের অনেকের যোগাযোগের দক্ষতাও দুর্বল থাকে।
যাদের প্রশিক্ষণের বেশি প্রয়োজন,তারাই পিছিয়ে
জাপানে যাওয়ার খরচ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার জাপানের জন্য প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বাবদ খরচ নির্ধারণ করেছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক হিসাব অনুযায়ী, জাপানে যাওয়ার আগে ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ডলার ব্যয় হয়। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ডলার এবং মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ৪ হাজার ডলার।
এই দুই ধরনের হিসাবের আওতা এক নয়। তবু ব্যবধানটি দেখায়, কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার প্রকৃত ব্যয় এবং নির্ধারিত খরচের মধ্যে পার্থক্য কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকলে এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বাড়তে পারে।
এখানে আরেকটি সমস্যা হলো, নিয়োগকর্তারা অনেক সময় প্রার্থীর যোগ্যতা ও সনদের সত্যতা সহজে যাচাই করতে পারেন না। ফলে সঠিক ও ভুল সনদধারীকে আলাদা করা কঠিন হলে সব প্রার্থীর প্রতিই সন্দেহ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ জর্জ আকারলফের বাজারবিষয়ক বিশ্লেষণেও এ ধরনের তথ্যের অসমতার ঝুঁকি উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেছেন, ভুয়া সনদ ও জাল ব্যাংক বিবরণী জাপানের ভিসা জটিলতার বড় কারণ।
প্রশিক্ষণের ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ বা আর্থিক সহায়তার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ ঋণের যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য। কিন্তু জাপানি ভাষা শেখার জন্য ছয় মাসের ব্যয় বহনে আগ্রহী কর্মীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে যাদের প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁরাই পিছিয়ে পড়তে পারেন।
স্মারক সইয়ের তালিকা লম্বা, কিন্তু বাস্তবায়নে ঘাটতি কোথায়?
জাপানে কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশ অতীতেও একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। ২০১৭ সালে আইএম জাপানের সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থী পাঠানোর চুক্তি হয়। ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত হয় এসএসডব্লিউ কর্মসূচির সহযোগিতা স্মারক। ২০২৫ সালের মে মাসে মনোহরদীতে একটি মডেল প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং কর্মী নিয়োগ কাঠামো নিয়ে আরও দুটি স্মারক সই হয়। সর্বশেষ ১৭ অক্টোবরের স্মারকটির মেয়াদ পাঁচ বছর, যা পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু চুক্তি সই করার পর বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, বেসরকারি নিয়োগকারী সংস্থা, ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও টোকিওর দূতাবাসকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। জাপানের দিকেও রয়েছে একাধিক সরকারি সংস্থা ও নিয়োগকর্তা। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে।
সরকার একটি জাপান সেল গঠন করেছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে বাস্তবে কতটা সমন্বয় তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি।
নতুন ইএসডি কর্মসূচিতে কাজ শুরুর আগে জেএফটি বেসিক পরীক্ষার এ ওয়ান স্তর অথবা জেএলপিটির এন ফাইভ স্তরের সমতুল্য যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, কিংবা সমমানের ভাষা কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। তিন বছর পর এসএসডব্লিউ কর্মসূচিতে যেতে প্রয়োজন হবে এ টু স্তর বা এন ফোর এবং সংশ্লিষ্ট দক্ষতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। এই ব্যবস্থায় শুরুতে ভাষাগত যোগ্যতার শর্ত কিছুটা সহজ হলেও প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করার দায়িত্ব কমে না, বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এবার প্রয়োজন বাস্তব ফলাফল
বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ শুধু দক্ষ কর্মীর অভাব নয়। পরীক্ষার ফল বলছে, আগ্রহী প্রার্থীদের একটি অংশ ভাষা পরীক্ষায় ভালো করছেন। কিন্তু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম, দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ সীমিত, প্রশিক্ষণের মানে অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং বিদেশে যাওয়ার খরচ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে প্রথমে জাপানি নিয়োগকর্তাদের প্রকৃত চাহিদা জানতে হবে। কোন কোম্পানিতে কোন পেশায় কতজন কর্মী প্রয়োজন, কী ধরনের দক্ষতা লাগবে এবং কোন পরীক্ষা পাস করতে হবে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। আগে থেকে চাকরির চাহিদা না জেনে প্রশিক্ষণ দিলে কর্মীরা সনদ পেয়েও কাজ না পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, ভাষা ও দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিতে হবে। আরও বেশি পেশায় বাংলাদেশ থেকে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে জাপানের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নিয়োগের সব খরচ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং ভুয়া সনদ যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভাষা শেখার ছয় মাসের ব্যয় মেটাতে কর্মীদের জন্য ঋণ বা ভাতার সুযোগও বিবেচনা করা দরকার।
সবশেষে, জাপানে কর্মী পাঠানোর সাফল্য মাপতে হবে বাস্তব ফলাফল দিয়ে। কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন বা কতটি স্মারক সই হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন চাকরি পেলেন, তাঁদের বিদেশে যেতে কত খরচ হলো এবং তাঁরা কর্মস্থলে কত দিন টিকে থাকতে পারলেন। এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়ব্যবস্থার পাশাপাশি জাপান সেলের কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ফলাফলও নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
জাপানের শ্রমবাজারে সুযোগ আছে, কিন্তু সেই সুযোগ স্থায়ী নয়। নির্ধারিত কর্মীসংখ্যার সীমা পূরণ হলে নতুন নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তাই শুধু সমঝোতা স্মারক সই করে সাফল্য দাবি করার সময় শেষ। এখন প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করে বাস্তবে কতজন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেন, তা নিশ্চিত করা। মূল প্রশ্ন এখন একটাই, কাগজে থাকা প্রতিশ্রুতিকে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান সাফল্যে রূপ দিতে বাংলাদেশ কত দ্রুত পারবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

