বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ যে পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বাংলাদেশকে বিদেশি ঋণের বিপরীতে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। অথচ একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রকৃত অর্থছাড় এসেছে মাত্র ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ঋণের আসল হিসেবে দিতে হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার। আর সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। সব মিলিয়ে আগের বছরের তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে।
ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার পাশাপাশি কমেছে বিদেশি অর্থের প্রবাহ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণ ও অনুদান ছাড় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রকৃত অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
এবারের অর্থছাড়ের মধ্যে ঋণ হিসেবে এসেছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অনুদান এসেছে ১২ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এই তিন মাসে বাংলাদেশ যত বিদেশি সহায়তা পেয়েছে, ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে তার চেয়ে প্রায় ৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার বেশি। অন্যভাবে বললে, বিদেশি সহায়তা হিসেবে প্রতি এক ডলার পাওয়ার বিপরীতে ঋণ শোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ ডলার ৪ সেন্ট।
অন্যদিকে, নতুন বিদেশি ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে। ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ডলারের নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ১১৪ কোটি ৭৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার এবং অনুদানের প্রতিশ্রুতি ১২ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
তবে নতুন ঋণ বা অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া আর সেই অর্থ বাস্তবে হাতে আসা এক বিষয় নয়। প্রকল্প ও চুক্তিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে অর্থ ছাড় হতে পারে। বড় কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগীর নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতির চিত্রও ছিল দুর্বল। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), চীন, রাশিয়া ও ভারত এ সময়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বড় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে শুধু জাপান ৩৫ লাখ ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও এসব দেশ ও সংস্থা আগের প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ ছাড় অব্যাহত রেখেছে।
সামগ্রিক চিত্রে তাই দুটি বিষয় স্পষ্ট। একদিকে আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বিদেশি সহায়তার প্রকৃত অর্থছাড় কমছে। প্রতিশ্রুতি বাড়লেও সেই অর্থ সময়মতো ছাড় না হলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক অর্থের প্রবাহে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসে না। ফলে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থছাড়ে রূপ দেওয়া এবং ঋণ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

