আদালতে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্প নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে এখন ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্ট ও সংশ্লিষ্ট আদালতের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িয়ে আছে। মোট টাকা ক্রেতার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে একজনের ভাগে গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা পড়ে; অঙ্কটি বুঝিয়ে দেয়, একজন ক্রেতার জন্য ঝুঁকিটা কত বড় হতে পারে। অবশ্য একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এগুলো বিচারাধীন মামলা। অর্থাৎ, এসব ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। একইভাবে, জমির শেয়ার কিনে মালিকানা পাওয়ার ধারণাটিও নিজে কোনো অপরাধ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বিক্রেতা জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন কিংবা নকশা সম্পর্কে ক্রেতার কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করেন।
স্বপ্ন নাগালের বাইরে গেলে ফাঁদ পাতা সহজ হয়
মানুষ যে কারণে জমির শেয়ার কিনতে আগ্রহী হচ্ছে, তার একটি বড় কারণ জমির আকাশছোঁয়া দাম। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ সাল পর্যন্ত আগের ২১ বছরে ঢাকায় জমির দাম বেড়েছে ২৭ গুণেরও বেশি। একই সময়ে ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে সাত গুণের বেশি। গুলশানে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির গড় দাম ছিল ২২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অন্যদিকে, ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন।
এমন বাস্তবতায় একজন মধ্যবিত্ত মানুষ যখন নিজের আয় ও সঞ্চয়ের হিসাব করেন, তখন তাঁর কাছে একটি তৈরি ফ্ল্যাট কেনা অনেক সময় অসম্ভব স্বপ্ন বলে মনে হয়। এই সুযোগেই আসে জমির শেয়ার কেনার প্রস্তাব। একটি জমিকে কয়েকটি শেয়ারে ভাগ করে বিক্রি করা হয়। ক্রেতাকে বলা হয়, তিনি নিজের কেনা শেয়ারের অনুপাতে জমির মালিকানা পাবেন, পাশাপাশি নির্দিষ্ট আকারের একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার সুযোগও থাকবে।
উত্তরখানের এক ক্রেতা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে তিনি ১৫ লাখ টাকায় একটি শেয়ার কেনার চুক্তি করেছিলেন। বিনিময়ে ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা ছিল। তৈরি ফ্ল্যাটের তুলনায় প্রাথমিক বিনিয়োগ কম হওয়ায় এমন প্রস্তাব অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু কম টাকায় ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় মানুষ যখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, তখন জমির কাগজপত্র ও প্রকল্পের অনুমোদন যাচাই করার সময়ও কমে আসে। আমার পর্যবেক্ষণ, ক্রেতার এই তাড়াহুড়াকেই প্রতারকেরা কাজে লাগান।
একই জমি, একাধিক ক্রেতা
টিবিএস এর প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলো দেখলে প্রতারণার কয়েকটি পরিচিত কৌশল চোখে পড়ে। হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের উত্তরখানের একটি প্রকল্পে ১০ কাঠা জমিতে নয়তলা ভবন নির্মাণের কথা বলে ৩৬টি শেয়ার বিক্রি করা হয়েছিল। ক্রেতা আসাদুল ইসলাম রুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে ৩৬ জনই তাঁদের টাকা পরিশোধ করেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, একই জমির শেয়ার আরও ৪০ জনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
রুমনের অভিযোগ, তাঁকে রাজউকের একটি ভুয়া নকশা দেখানো হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, জমিটি নিজেদের মালিকানাধীন বলে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে সেটি ভাড়া নেওয়া ছিল এবং সেখানে শুধু একটি সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছিল। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সাতটি প্রকল্পে ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রেপ্তার হয়ে এখনো কারাগারে রয়েছেন। টিবিএসের প্রতিবেদকেরা উত্তরায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ পান।
সিলেটের লামাবাজারেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ৪০ কাঠা জমিতে ১০তলা ভবনের নকশা দেখিয়ে ১৫০ জন ক্রেতার কাছ থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। এক ক্রেতার দাবি, পরে তাঁরা জানতে পারেন, জমিটি সরকারের খাসজমি।
এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই দেবেন। তবে অভিযোগগুলোর মধ্যে তিনটি বিষয় বারবার সামনে আসছে। একই জমির শেয়ার একাধিকবার বিক্রি, ভুয়া নকশা দেখানো এবং জমির প্রকৃত মালিকানা গোপন করা। তিন ক্ষেত্রেই মূল সমস্যাটি এক: বিক্রেতা যে তথ্য জানেন, ক্রেতা তা জানেন না।
অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে বলা হয় তথ্যের অসমতা। ২০০১ সালে জর্জ অ্যাকারলফ, মাইকেল স্পেন্স ও জোসেফ স্টিগলিৎজ তথ্যের অসমতা নিয়ে তাঁদের গবেষণার জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। অ্যাকারলফের ১৯৭০ সালের বিখ্যাত গবেষণার মূল বক্তব্য হলো, কোনো পণ্যের মান সম্পর্কে বিক্রেতা ক্রেতার চেয়ে বেশি জানলে বাজারে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ক্রেতা ভালো ও খারাপ পণ্যের পার্থক্য বুঝতে না পারলে অসাধু বিক্রেতারা নিম্নমানের পণ্য নিয়েও বাজারে সুবিধা পেতে পারেন। একপর্যায়ে ভালো পণ্য বিক্রেতারাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
আবাসন খাতেও এমন ঝুঁকি তৈরি হয়, যখন ক্রেতার পক্ষে জমির মালিকানা কিংবা প্রকল্পের অনুমোদন যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা কমানোর জন্যই রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়ার আগে ক্রেতার কাছে কোনো ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রি কিংবা বিক্রির চুক্তি করা যায় না। ডেভেলপারকে ক্রেতার সামনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং জমির মালিকানার দলিল দেখাতে হয়। অর্থাৎ, এই কাগজপত্র দেখানোর আগেই বিক্রি শুরু করার কথা নয়।
‘আরজেএসসিতে নিবন্ধিত’ শুনলেই কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়?
অনেক ক্রেতা মনে করেন, কোনো প্রতিষ্ঠান কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত থাকলেই তার আবাসন প্রকল্পও বৈধ। এই ধারণা তাঁদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর বা আরজেএসসি কোম্পানি গঠন ও নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করে। কোনো প্রতিষ্ঠান সেখানে নিবন্ধিত হওয়ার অর্থ হলো, সেটি কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত। এই সনদ নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে বা তার কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন রয়েছে।
আবাসন ব্যবসার জন্য আলাদা নিবন্ধনের বিধান আছে। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। ঢাকায় এই কর্তৃপক্ষ রাজউক। আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এই ধারায় নিবন্ধিত ব্যক্তিকেই ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স আরজেএসসিতে নিবন্ধিত হলেও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয়। টিবিএস রাজধানীতে প্রতারণার ২০টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এর মধ্যে ১৬টির সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠান জড়িত, যারা নিজেদের আবাসন কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু রিহ্যাবের সদস্য নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের আগে অ্যাপার্টমেন্ট বা প্লট বিক্রির অভিজ্ঞতাও ছিল না।
তবে এই তথ্যের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। ঘটনাগুলো টিবিএসের বাছাই করা নমুনা, পুরো আবাসন বাজারের চিত্র নয়। তাই এই অনুপাতকে দেশের সব আবাসন প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
রিহ্যাবের সদস্যপদও আইনে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। নিবন্ধনের আবেদনে সদস্যপদের কপি চাওয়া হয় কেবল সেটি থাকলে। সদস্যপদ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি উপায় এবং অভিযোগ জানানোর একটি জায়গা হতে পারে। সিলেটের আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন সারেগের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সংগঠনের সদস্য না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু ক্রেতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ডেভেলপারের নিবন্ধন, প্রকল্পের অনুমোদন এবং জমির মালিকানার দলিল। আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী, ডেভেলপারের প্রসপেক্টাসে নিবন্ধন নম্বর এবং অনুমোদিত নকশার স্মারক নম্বর ও তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে।
আইন আছে, কিন্তু ভয় কোথায়?
শাস্তির বিধান দেখলে বোঝা যায়, আইনটি বিভিন্ন অপরাধের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রেখেছে। আইনের ১৯ ও ২০ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া আবাসন ব্যবসা পরিচালনা কিংবা অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরু, বিজ্ঞাপন প্রকাশ বা বিক্রি করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর ২৪ ধারা অনুযায়ী, ক্রেতাকে না জানিয়ে প্রতিশ্রুত সম্পত্তি অন্য কারও কাছে বিক্রি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এবার অঙ্কের ব্যবধানটি দেখুন। হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ এই আইনের একটি অপরাধে সর্বোচ্চ জরিমানা ২০ লাখ টাকা, যা অভিযোগের ওই অঙ্কের এক হাজার ভাগের এক ভাগ।
এর বাইরেও আইনের ৩২ ধারায় এই আইনের অপরাধগুলোকে আপোষযোগ্য, জামিনযোগ্য ও অআমলযোগ্য বলা হয়েছে। অআমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত পুলিশ পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে না। আইনের ৩৫ ধারা অনুযায়ী, আদায় করা জরিমানার সর্বোচ্চ অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাকে দেওয়ার আদেশও আদালত দিতে পারেন।
অবশ্য এসব ঘটনার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির প্রতারণাসংক্রান্ত ধারায়ও মামলা হতে পারে। সেখানে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানার বিধান রয়েছে। রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদও বলেছেন, এসব ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা হচ্ছে।
তবু শাস্তির বিধান থাকলেই যে প্রতারণা বন্ধ হবে, তা নয়। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের অপরাধ ও শাস্তি নিয়ে তত্ত্বের মূল বক্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। অপরাধ করার সিদ্ধান্ত শুধু শাস্তির কঠোরতার ওপর নির্ভর করে না, অপরাধী ধরা পড়বেন এবং দোষী সাব্যস্ত হবেন কি না, সেই সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বের আলোক, ধরা পড়ার ঝুঁকি যদি কম বা অনিশ্চিত হয়, তাহলে আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তা প্রতারকের সিদ্ধান্তে যথেষ্ট প্রভাব নাও ফেলতে পারে।
তদারকির ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন রয়েছে। রাজউকের মুখপাত্র বলেছেন, সংস্থাটি নিয়মিত অভিযান চালায় এবং গত কয়েক মাসে অনেক অবৈধ প্রকল্প বন্ধ করেছে। অভিযোগ পেলে আরও জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার টাকা চলে যাওয়ার পরই প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ জমা পড়ার আগেই যদি অননুমোদিত প্রকল্প শনাক্ত করা যায়, তাহলে ক্ষতি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।
কামাল মাহমুদ আরও অভিযোগ করেছেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সেলে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায় না এবং রাজউকের কিছু কর্মকর্তা প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত। এটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিযোগ, প্রমাণিত তথ্য নয়। টিবিএসের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে রাজউকের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো জবাবও পাওয়া যায়নি। তবে আইনের ২০ ধারা তদারকির একটি সুযোগ তৈরি করে। অনুমোদনহীন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করাও যখন অপরাধ, তখন ক্রেতার ক্ষতি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে বিজ্ঞাপন দেখেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
মামলা করেও টাকা ফেরত পাওয়া এত কঠিন কেন?
মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার বা ক্ষতিপূরণ পাওয়া এক বিষয় নয়। জুলাইয়ে সংসদে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশের আদালতগুলোতে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এত বিপুলসংখ্যক মামলার ভিড়ে আবাসন প্রতারণার মামলাগুলোকেও বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অথচ এই আইনের অধীন অপরাধগুলো প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচারের বিধান রয়েছে।
একজন ক্রেতার অভিজ্ঞতা সময়ের এই দীর্ঘসূত্রতা বুঝতে সাহায্য করে। সিলেটের ওই ক্রেতা ২০১৭ সালে জমির শেয়ার কিনেছিলেন। ২০২০ সালের শুরুর দিকে সব শেয়ার বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু ২০২৬ সালেও তিনি প্রতিকার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, ডেভেলপার নির্ধারিত সময়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে না পারলে ছয় মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণসহ ক্রেতার পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে। চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের হার উল্লেখ না থাকলে তা ১৫ শতাংশ হবে। তবে আইনের সংজ্ঞায় ডেভেলপার বলতে নিবন্ধিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। ফলে যিনি নিবন্ধনই নেননি, তাঁর ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা একটি আইনি প্রশ্ন। এ বিষয়ে আইনজীবীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া কিছু অপরাধসংক্রান্ত বিরোধে আইনের ৩৬ ধারা অনুযায়ী প্রথমে আপোষের চেষ্টা করতে হয়, এরপর রয়েছে সালিসি ট্রাইব্যুনালের ধাপ। বাস্তবে এই প্রক্রিয়া মামলার নিষ্পত্তিতে কতটা সময় যোগ করে, তা বোঝার জন্যও আইনজীবীদের মতামত প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে দেওয়া সংখ্যাগুলোতেও একটি লক্ষণীয় পার্থক্য দেখা যায়। ঢাকায় মামলা সবচেয়ে বেশি, ৫ হাজার ৯৪৮টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আমার হিসাব অনুযায়ী, এখানে মামলা প্রতি গড় অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সিলেটে ২১৩টি মামলায় জড়িত অর্থ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ মামলাপ্রতি গড় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মুন্সিগঞ্জে ৫৩৮টি মামলায় টাকার পরিমাণ দেড় হাজার কোটির বেশি, ফলে মামলাপ্রতি গড় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ঢাকার তুলনায় এসব এলাকায় মামলার সংখ্যা কম হলেও প্রতিটি মামলায় জড়িত অর্থের গড় পরিমাণ বেশি। তবে এই তথ্য দিয়ে এর কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তারপরও একটি প্রশ্ন ওঠে: ঢাকার বাইরে আবাসন প্রকল্পের তদারকি কি তুলনামূলকভাবে দুর্বল?
এটা কয়েকটা ভুয়া কোম্পানির গল্প নয়
সবকিছু মিলিয়ে সমস্যাটিকে শুধু কয়েকটি অসাধু প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রেতার আস্থা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। ক্রেতারা সনদ, বিজ্ঞাপন ও নকশা দেখে ভরসা করেছেন। অথচ আইন অনুযায়ী প্রকল্পের বৈধতা নিশ্চিত করার দায় প্রথমে বিক্রেতার, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে।
ক্রেতার নিজেরও কিছু বিষয় যাচাই করা জরুরি। রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেছেন, জমির শেয়ার কেনার আগে দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠানটি রিহ্যাবের সদস্য কি না, প্রকল্পের রাজউকের অনুমোদন আছে কি না এবং জমির মালিকানার কাগজপত্র ঠিক আছে কি না। এর পাশাপাশি প্রসপেক্টাসে ডেভেলপারের নিবন্ধন ও প্রকল্পের অনুমোদনের নম্বর আছে কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার। জমির দলিল এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিজে নিশ্চিত হওয়া উচিত। টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংক ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আইনের ১২(১) ধারায় ব্যাংকের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের কথা বলা হয়েছে।
তবে সব দায় শুধু ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিলে সমাধান হবে না। কর্তৃপক্ষকে প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই কোনো প্রকল্পের বৈধতা যাচাই করতে পারেন। আইনেই নিবন্ধিত ডেভেলপারদের তালিকা সংরক্ষণ ও প্রকাশের কথা রয়েছে। তাই জমির মালিকানা যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্ত করার পাশাপাশি অননুমোদিত প্রকল্পের বিজ্ঞাপনের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালানো দরকার। অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অনেক ক্রেতাকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।
সবচেয়ে জরুরি হলো, অপরাধের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা যেন দ্রুত এবং কার্যকর হয়। প্রতারকেরা যাতে ধরা পড়া ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি অনুভব করেন, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি অপরাধের আর্থিক পরিমাণের তুলনায় জরিমানার সীমা যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু প্রতারককে নিয়ে নয়, সেই ব্যবস্থাকেও নিয়ে, যেখানে একটি সাইনবোর্ড, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর একটি ভুয়া নকশার ওপর ভরসা করে কেউ তাঁর জীবনের সঞ্চয় হারাতে পারেন। এমন ক্ষতি ঠেকানোর দায় কি শুধু ক্রেতার, নাকি তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে, তারও?
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

