কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে গড়ে ওঠা গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে জাপানের বিগ-বি উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরে গেলে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় প্রকল্পটিকে নতুন স্তরে নেওয়ার কথা বলা হয়। ঘোষণায় এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিগ-বি ফর শেয়ারড প্রসপ্যারিটি’, অর্থাৎ অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি। তবে এই ঘোষণার দুটি বিষয় নিয়ে দেশে বিশেষ আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি হলো কানেক্টিভিটির প্রসঙ্গ, অন্যটি ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উল্লেখ ও এর গুরুত্ব স্বীকার।
বিশেষ করে কানেক্টিভিটির নামে ভারতকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। দেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ঢাকার এক জনসভায় এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সরকারের ভাষ্য, এমন কোনো উদ্দেশ্য নেই।
বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গভীর সমুদ্রবন্দর। মাতারবাড়ি কক্সবাজারের সমুদ্রতীরবর্তী একটি ইউনিয়ন। এখানে প্রথমে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল বাংলাদেশ ও জাপান। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরাসরি সমুদ্রতীরে না করে সমুদ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার ভেতরে করা হয়। কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য মাটি কেটে ২৫০ মিটার চওড়া ও ১৪ কিলোমিটার লম্বা নৌ-চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়।
২০১৭ সালে জাইকার প্রাক-সমীক্ষায় নতুন একটি প্রস্তাব আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চ্যানেলে সামান্য পরিবর্তন করে এর দক্ষিণ দিকে বাণিজ্যিক বন্দর স্থাপন করা সম্ভব। একই চ্যানেল দুই প্রকল্পে ব্যবহার করলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে, খরচও কমবে। বাংলাদেশ পরে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে। ফলে চ্যানেলের গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ানো হয় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প শেষ পর্যন্ত গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত গড়ায়। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ।
বিগ-বির আওতায় কী হচ্ছে? বিগ-বির পূর্ণ নাম ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের এটি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা। মাতারবাড়ির গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল গড়তে এবং পণ্য সরবরাহের জন্য সার্বিক পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করতে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে জাপান। ইতিমধ্যে সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। এর পর হবে এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চল।
যৌথ ঘোষণায় মূলত চারটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ভিত্তি করে ওই অঞ্চলে কানেক্টিভিটি তৈরি। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত, পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি জাপানি বিনিয়োগ আনা। চতুর্থত, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা, যার আওতায় বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার বাংলাদেশকে রপ্তানি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাঁর ভাষ্য, মাতারবাড়িতে প্রথম কাজ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এর ঘিরে জ্বালানি, লজিস্টিকস, অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। সেখানে পরিকল্পিত নগরও গড়া হচ্ছে, যাতে এটি বৈশ্বিক রপ্তানিকেন্দ্র হতে পারে। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আফ্রিকায় পণ্য পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে।
ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কলকারখানা, সমুদ্রবন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ সব অবকাঠামো মাতারবাড়িতেই করা হচ্ছে। এর জন্য বিপুল বিনিয়োগ মূলত জাপানই দেবে, তবে ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় বিনিয়োগে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কতটা লাভবান হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এ প্রকল্পে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। তাঁর ভাষ্য, এখানে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে বলে বলা হচ্ছে, যার ৪৮ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারই বেসরকারি বিনিয়োগ, মূলত জাপানি বিনিয়োগকারীদের। তিনি বলেন, বড় বিনিয়োগকারী এলে শুধু পণ্য নয়, প্রযুক্তিও আসবে। এতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও যৌথ উদ্যোগে যেতে উৎসাহী হবেন এবং সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বলা হচ্ছে, এর ফলে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে, যা কয়েক দশক ধরে ঘটবে।
ভারত নিয়ে সংশয় কেন? মাতারবাড়ি প্রকল্পের চুক্তি আওয়ামী লীগ আমলে জাপানের সঙ্গে হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণা সামনে রেখে পরিকল্পনা করেছিল জাপান। ২০১৪ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বিগ-বির ধারণা প্রথম সামনে আনেন। একই বছরের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে জাইকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য এই ধারণার প্রথম ভিত্তি, দ্বিতীয় ভিত্তি জ্বালানি এবং তৃতীয়টি পরিবহনব্যবস্থা।
২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব আবার উঠে আসে। অর্থাৎ বিগ-বি উদ্যোগে ভারত সব সময়ই প্রাসঙ্গিক ছিল। এখন ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দুই দেশ উদ্যোগটিকে নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা আরও জোরদার হয়েছে।
তারেক রহমানের জাপান সফরের যৌথ ঘোষণায় ভারত বা অন্য কোনো দেশের নাম সরাসরি নেই। তবে কানেক্টিভিটির প্রসঙ্গ এবং মাতারবাড়িকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা থেকে স্পষ্ট, প্রকল্পটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। এখানে প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত প্রাসঙ্গিক। ফলে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতকে সুবিধা দেওয়া হবে কি না, এমন সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। ভারত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সব সময়ই স্পর্শকাতর ইস্যু।
গত ৩১ অক্টোবর ঢাকার এক সমাবেশে ভারতের নাম উল্লেখ না করেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, মাতারবাড়ি প্রকল্পে কৌশলে কাউকে কানেক্টিভিটি দেওয়া হচ্ছে কি না। তিনি বলেন, গভীর বন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
উদ্বেগের কারণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে দলটি নতুন করে মন্তব্য করেনি। তবে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা ও সম্পাদিত চুক্তিগুলো যাচাই করে পরে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হবে। তবে জামায়াতসহ কয়েকটি দলের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, তাদের উদ্বেগ মূলত ভারতের সম্পৃক্ততা এবং এর মাধ্যমে দেশটি করিডর বা ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বিগ-বির অর্থনৈতিক মডেল চমৎকার। তবে এতে ভারতের মতো দেশকে সুবিধা দিতে হলে আগে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে কানেক্টিভিটি করে একীভূত বাজার তৈরির চিন্তা ভালো, কিন্তু সেই ঐকমত্য এখনো হয়নি। রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে বড় সমস্যায় পড়তে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়িত নাও হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ভূ-রাজনীতির প্রশ্নও সামনে। সংশয় শুধু ভারতকে ঘিরে নয়। চীন এই প্রকল্পকে কীভাবে দেখবে, সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ যৌথ ঘোষণায় জাপান মুক্ত ও স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা বলেছে। এই কৌশল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ, যাকে চীন নিজেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা হিসেবে দেখে। জাপান এ কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জাপান বিগ-বি ধারণায় ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ধাপে ধাপে অঞ্চলের আরও দেশ এতে যুক্ত হতে পারে। তাঁর মতে, এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় আছে, কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাববলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা। বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতেই জাপান বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, এমন ধারণাও আছে। তাই বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে বলছেন।
গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশের মূল নজর থাকা উচিত অর্থনীতিতে। চীনা বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে ভারতের বড় বাজারও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কোনো জোটে বড়ভাবে রাজনৈতিকভাবে না জড়িয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কৌশল ঠিক করতে হবে। সাকিব আলীও একই মত দিয়ে বলেন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, সবার সঙ্গেই সহযোগিতা বাড়াতে হবে। কাজটি বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়, তবে এটাই পথ।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ভারসাম্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, সব দেশের সঙ্গেই সরকার বিনিয়োগে আগ্রহী। ইতিমধ্যে চীন থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ হচ্ছে। চট্টগ্রামে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোও আছে। তিনি জানান, মাতারবাড়ি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রস্তাবের যৌক্তিক ভিত্তি ও বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই তা গ্রহণ করা হবে।
সব মিলিয়ে মাতারবাড়ি প্রকল্পে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও স্পষ্ট। বিপুল ঋণ ও বিনিয়োগের এই প্রকল্পে ভারত, চীন ও জাপানের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাই সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

