বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ যোগান দেয়। তবে ভবিষ্যতে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, চামড়া, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববাজারের চাহিদা, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সরকারি নীতিসহায়ক পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব খাত আরও বিকশিত হতে পারে। তাই পোশাক শিল্পের পাশাপাশি নতুন খাতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণই হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের উপর নির্ভরশীল। এই খাতটি দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ অবদান রাখে । তবে একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বৈচিত্রকরণ অত্যন্ত জরুরি। বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত গড়ে তুলতে পারলে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনশীলতা ও প্রতিযোগিতার মুখে দেশের অর্থনীতি আরো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। এই প্রতিবেদনে তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্রকরণের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করার প্রয়াস চালানো হয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতিতে পোশাকের নির্ভরতা ও বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা: বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তৈরি পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরশীল। যদিও পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তবে একক খাতে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিশ্ববাজারের ওঠানামার কারণে ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণে রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে এবং নতুন বাজার অন্বেষণ করতে হবে।
পোশাক শিল্পের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা: বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এই খাতের রপ্তানি ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ২০২৫ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি।
তবে এই প্রবৃদ্ধি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর ছুটির মৌসুমের কেনাকাটার কারণে হয়েছে যা সাময়িকভাবে রপ্তানি আয় বাড়ালেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়। এছাড়া কাঁচামাল আমদানি কম হওয়ার ফলে নিট রপ্তানি বৃদ্ধি পেলেও পোশাক শিল্পের উপর এত বেশি নির্ভরতা রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নতুন বাজার ও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, কানাডা ও বেলজিয়ামে রপ্তানি হয়। এসব দেশের মোট রপ্তানি আয় ৮ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার যা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে। ফলে রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে বাংলাদেশ নতুন বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। জাপানে পোশাক রপ্তানির হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে যা ভবিষ্যতে আরো সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে শুধুমাত্র পোশাক খাতের নতুন বাজার খোঁজাই যথেষ্ট নয় বরং অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানি বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সম্ভাবনাময় খাত: বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ অত্যন্ত জরুরি। কিছু সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে যেখানে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যেতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাত: বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাত দ্রুত বিকাশ লাভ করছে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO) খাতে দেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বর্তমানে ১৩৭টিরও বেশি দেশে আইসিটি সেবা রপ্তানি হচ্ছে। এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। যা বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ আইটি ও আইটিইএস (IT/ITES) খাত থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় অর্জন করে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।যেখানে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য বাজার তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালে আইসিটি খাত দেশের জিডিপির ১ দশমিক ২৮% অবদান রেখেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাত থেকে ৮৪ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদার তৈরি করা যা খাতটির বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল পরিষেবার চাহিদা বাড়ছে যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। ভবিষ্যতে এই খাত আরও গতিশীল হবে এবং রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
ওষুধ শিল্প: বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে একটি দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে পরিচিত। দেশটি বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে এবং এই খাতের অগ্রগতি অনেক promising। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮% পূরণ করা হচ্ছে দেশের নিজস্ব উৎপাদন দ্বারা। যদিও কাঁচামালের জন্য এখনও অনেকটাই বিদেশী সরবরাহের উপর নির্ভরশীলতা রয়েছে, তবে এই শিল্পের ভবিষ্যত অনেক উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ এবং কাঁচামাল উৎপাদিত হয়। এছাড়া এই শিল্পে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ইনসুলিন, হরমোন, ক্যান্সারের ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদিত হচ্ছে।যা দেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষভাবে ২০২৩ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়কালে দেশটির ওষুধ রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২ দশমিক ৪৫% বৃদ্ধি পেয়েছে যা শিল্পের বিকাশের একটি বড় সংকেত।
বর্তমানে দেশে ২৯৫টি অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে এই শিল্প আরও দ্রুত প্রসারিত হতে পারে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য: বাংলাদেশের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত, যা আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তবে এই শিল্পের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার আয় করেছে। তবে ২০১৫ সালে এই শিল্পের রপ্তানি আয় ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তী সময়ে হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে ৯৬১ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে ৯৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
এক সময় চামড়া ছিল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য তবে বর্তমানে তৈরি চামড়াজাত পণ্যের আধিক্য বেশি। বর্তমানে দেশে ২৬৪টি চামড়াজাত পণ্যের কারখানা রয়েছে। যার মধ্যে ৯৮% কমপ্লায়েন্স স্ট্যাটাস পেয়েছে, যা শিল্পের উন্নতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক।
এদিকে সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে নিয়ে যেতে চায়। বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীন প্রায় ৩০% বাজার দখল করে রেখেছে।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিপণ্য: বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বর্তমানে এসব পণ্য বিশ্বের ১৪৫টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, চা, শাকসবজি, ফল, মসলা, শুকনো খাবার, গবাদিপশু, পোল্ট্রি এবং মাছের খাবারসহ আরও কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলো হলো আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, কানাডা, ওমান, কাতার এবং নেদারল্যান্ডস। এই বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্রমশঃ বাড়ছে। বিশেষতঃ প্রতিষ্ঠান যেমন: প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যারা ১৪০-১৪৫ দেশে মসলা, জুস, মুড়ি, স্ন্যাকস এবং কনফেকশনারি পণ্য রপ্তানি করে আসছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল ৯৬৫ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯% বেশি। এর মধ্যে বড় ভূমিকা রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারের উন্নতির।
বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য উৎপাদন করছে যা এই খাতের আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী- ২০২২ সালে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ১৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশ তার অংশীদারি বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
পাট ও পাটজাত পণ্য: পাট ও পাটজাত পণ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত। কাঁচাপাট থেকে শুরু করে সুতা, বস্তা, ব্যাগ ও সুতলির মতো বিভিন্ন পণ্য দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পাট উৎপাদন কিছুটা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাট উৎপাদন ১৮ শতাংশ কমে প্রায় ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার বেলে নেমে এসেছে, যা শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনো বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৯১ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলারের কাঁচা পাট, ৩০ কোটি ডলারের পাটের সুতা, ১১ কোটি ডলারের পাটের বস্তা এবং ১০ কোটি ডলারের অন্যান্য পাটজাত পণ্য ছিল। যদিও পাট উৎপাদনে ভারত প্রথম স্থানে রয়েছে তবে রপ্তানিতে বাংলাদেশই বিশ্বসেরা।
পাটের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার ২০১০ সালে “পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন” প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় ধান, চাল, গম, ভূট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজসহ ১৭টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই হওয়ায় বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পাট খাত আবারও দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
তৈরি পোশাকের বাইরে বৈচিত্র্যকরণে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও মূলতঃ তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে অন্যান্য শিল্পে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। তবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসার পরিবেশে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে যা বিনিয়োগের জন্য বড় বাঁধা। শ্রমিক অসন্তোষ এবং ন্যায্য মজুরি নিয়ে সমস্যা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকায় কাঁচামালের সংকট ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো খুবই কম। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ধীরগতির হওয়ায় শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ছে না। দক্ষ জনবলের অভাবও নতুন খাতের প্রসারে অন্যতম বাঁধা। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট করছে। নতুন বাজার খুঁজে পাওয়া আর বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন বৈশ্বিকভাবে বড় ইস্যু। পাশাপাশি ব্যবসায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি যাতে নতুন খাত সহজে গড়ে উঠতে পারে। এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

তৈরি পোশাকের বাইরে বৈচিত্র্যকরণে করণীয়: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও শিল্পের বৈচিত্র্য আনা জরুরি। এর জন্য নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তির উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গঠন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমতঃ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়াও চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালকা প্রকৌশলের মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে নবায়নযোগ্য শক্তি, সৌর প্যানেল উৎপাদন ও আধুনিক কারখানা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দ্বিতীয়তঃ প্রযুক্তির উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সহজ হবে।
তৃতীয়তঃ শিল্প খাতে দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে তরুণরা বিদেশমুখী হবে যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই দেশে সুযোগ সৃষ্টি করে মেধা ধরে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থতঃ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পের প্রসার যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে সে বিষয়ে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
এছাড়া তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন বাজার তৈরি করতে হবে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। পণ্যের মান বাড়ানো সরবরাহ শৃঙ্খল আরো শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে যা একদিকে বড় অর্জন অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ। শুল্ক সুবিধা হারানোর পর কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় তা নিয়ে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য শিল্পেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গঠন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নতুন বাজার খোঁজার মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব। একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং সরকার-উদ্যোক্তা-শ্রমিকদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এখন সময় এসেছে সেই অর্জনকে আরও বিস্তৃত করে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করার, যাতে ভবিষ্যতে দেশ আরও টেকসই ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

