চাকরি, না ব্যবসা? তরুণদের জীবনে এই প্রশ্ন যেন এক অবিচ্ছেদ্য দ্বন্দ্ব। বর্তমান সময়ে তরুণদের জীবনে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—চাকরি করবো, না ব্যবসা করবো? একদিকে চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত আয় এবং প্রতিষ্ঠা আবার অন্যদিকে ব্যবসার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং আকাশছোঁয়া সম্ভাবনা। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার প্রসারে এই প্রশ্নের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, শিক্ষিত বেকারত্বের বাস্তবতা এবং নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা তরুণদের এই দ্বিধার মুখোমুখি করেছে। অনেকেই বছর ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকে। আবার কেউ নিজের ছোট্ট উদ্যোগ দিয়ে বদলে দিচ্ছে জীবনের গতিপথ। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি আর শুধু পেশা বাছাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—এটি হয়ে উঠেছে তরুণদের ভবিষ্যৎ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট ও চাকরির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের শ্রমবাজার বর্তমানে এক জটিল ও চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়ে আসে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না অনেকেরই। কারণ কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন সীমিত, তেমনি প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে বহুগুণ। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরি পাওয়ার জন্য যোগ্যতা ও দক্ষতার মানদণ্ডও ক্রমশঃ কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি মনে না হলেও বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। কারণ এই হিসাবের বাইরে থাকা আংশিক বেকার, কর্মহীন তরুণ এবং শিক্ষাজীবন শেষে অপেক্ষমাণ বিশাল জনগোষ্ঠীকে এতে ধরা হয় না। ফলে প্রকৃত বেকারত্বের চিত্র আরও গভীর ও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যখন সরকারি চাকরি বিশেষ করে বিসিএস-এর মতো পরীক্ষায় লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ে, কিন্তু পদ থাকে মাত্র কয়েক হাজার। বেসরকারি খাতেও প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও মানসম্মত চাকরির সুযোগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
শুধু সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, গুণগত মানেও চাকরির বাজারে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাঁদের মধ্যে ব্যবহারিক দক্ষতা, সফট স্কিল বা প্রযুক্তিগত জ্ঞান অনেক সময়ই অনুপস্থিত থাকে। ফলে চাকরিদাতারা দক্ষ প্রার্থী খুঁজে পেতে হিমশিম খান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলতঃ “চাকরিমুখী” কিন্তু “দক্ষতাভিত্তিক” নয়। যার ফলে একদিকে তরুণরা চাকরি পাচ্ছে না, আবার অনেক চাকরি খালি থাকছে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির অভাবে।
এছাড়া শিল্পখাতেও এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। নানা কারণে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এতে করে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও কর্মকর্তা কর্মহীন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন কর্মজীবীদের ওপর ক্রমাগত নতুন দক্ষতা অর্জনের চাপ সৃষ্টি করছে। যেসব তরুণ সময়মতো এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না, তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে।
বেসরকারি খাতেও অনিশ্চয়তার ছায়া বিস্তৃত। কাজের চাপ বেশি, বেতন কাঠামো অনেক সময় অনুন্নত এবং চাকরিচ্যুতির ঝুঁকিও থাকে সব সময়। তদুপরি কর্পোরেট সংস্কৃতিতে কাজের সময়, পরিবেশ ও চাপ অনেক তরুণের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বাংলাদেশে চাকরি পাওয়া যেন শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয় বরং এক ধরনের মানসিক ও প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা। এই বাস্তবতা তরুণদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনছে। অনেকে এখন আর চাকরিকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখে না বরং নিজে কিছু করার চিন্তায় এগিয়ে আসছে। ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি এই আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে, যেটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
চাকরির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা: চাকরি এখন শুধু আয়ের একটি উৎস নয় বরং জীবনের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তবে এর যেমন কিছু স্পষ্ট সুবিধা আছে, তেমনি রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও—যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির সুবিধা-অসুবিধাগুলো নতুন করে ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।
চাকরির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। নিয়মিত বেতন, উৎসব ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা একজন কর্মজীবী মানুষকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে স্থিতিশীলভাবে জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। সরকারি চাকরিতে অবসরের পর পেনশন এবং চিকিৎসা সুবিধাও একটি বড় আকর্ষণ। বেসরকারি চাকরিতে যদিও পেনশন নেই, তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, পরিবহন সুবিধা, ইনসেন্টিভ ও অন্যান্য পার্ক দেওয়া হয়।
চাকরি সামাজিকভাবে একধরনের মর্যাদা এনে দেয়। “ভালো চাকরি” পাওয়া এখনো অনেক পরিবার ও সমাজের কাছে একজন ব্যক্তির সফলতার মাপকাঠি। বিশেষ করে সরকারি চাকরি পাওয়া অনেকাংশে “জীবন সেফ” করার একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়।
তবে চাকরির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার দিকটিও কম নয়। বেশিরভাগ চাকরিতেই রয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের চাপ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন। এতে মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা ব্যক্তির জীবনের অন্যান্য দিককে প্রভাবিত করতে পারে। অনেকে অভিযোগ করেন, নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আর কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তাদের সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাশক্তি ব্যাহত হয়।
সরকারি চাকরিতে বদলি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়ায়, যা পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আবার অধিকাংশ সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির হার ধীরগতির হওয়ায় অনেক সময় কর্মীদের আগ্রহ ও কর্মস্পৃহা হ্রাস পায়। অপরদিকে বেসরকারি চাকরিতে চাকরির নিশ্চয়তা বা “জব সিকিউরিটি” অনেকটাই অনির্ভরযোগ্য। কোম্পানির অবস্থা খারাপ হলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি সব সময়ই থাকে।
এছাড়াও দেশের অনেক চাকরির ক্ষেত্রেই কর্মপরিবেশ এখনো কর্মীবান্ধব নয়। বিশেষ করে নারী কর্মীদের জন্য নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পদোন্নতিতে বৈষম্য ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ এখনো প্রকট। অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন দক্ষতা অর্জনের চাপও অনেক চাকরিপ্রার্থীর জন্য একটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুতরাং বলা যায় চাকরির যেমন একটি সুসংগঠিত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা আছে, তেমনি রয়েছে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। একজন তরুণের জন্য কোন পেশা ভালো হবে—তা নির্ভর করে তার দক্ষতা, মনোভাব, জীবনদর্শন এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার ওপর। তাই চাকরিকে একমাত্র পথ হিসেবে না দেখে বিকল্প চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগের সুযোগগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করাটাই আজ সময়ের দাবি।
ব্যবসার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: বর্তমান বিশ্বে ব্যবসা শুধু একটি আয়ের পথ নয় বরং উদ্ভাবন, স্বাধীনতা এবং সম্ভাবনার দিগন্তও খুলে দেয়। তরুণ প্রজন্মের অনেকে এখন চাকরির পরিবর্তে ব্যবসাকে বেছে নিচ্ছে। কারণ এতে নিজের সিদ্ধান্তে চলার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতার প্রকাশ এবং আয়ের পরিধি তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে ব্যবসা শুরু করা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি তা অনেক চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্বেরও বিষয়।
ব্যবসার বড় একটি সম্ভাবনা হলো নতুন বাজার ও পণ্যের চাহিদা। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পণ্য বা পরিষেবা পৌঁছানো অনেক সহজ হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা অটোমেশন প্রযুক্তি যেমন ব্যবসায় নতুন সুযোগ এনে দিচ্ছে, তেমনি উদ্যোক্তারা এখন গ্রাহকের পরিবর্তিত রুচি ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পণ্যের ধারণা তৈরি করতে পারছেন। এছাড়া সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে—যা ব্যবসায় প্রবেশ সহজ করেছে।
তবে ব্যবসার এই সম্ভাবনার মাঝেও কিছু বাস্তব ও কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন: অর্থনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় বাঁধা। মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি নির্ভরতা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া দক্ষ জনবলের অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি এবং পুঁজির সীমাবদ্ধতা অনেক সময় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে।
প্রতিযোগিতা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে প্রায় সব খাতেই ছোট-বড় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ফলে বাজারে টিকে থাকতে হলে নতুনত্ব, মান এবং গ্রাহকসেবার দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক জটিলতা—যেমন: কর কাঠামোর জটিলতা, লাইসেন্স নেওয়ার বিড়ম্বনা, ফি ও ঘুষের culture। যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় ব্যাংক বা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে চায় না। বিশেষ করে যদি উদ্যোগটি নতুন হয় বা উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কম থাকে।
বাংলাদেশ SME ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে দেশের বেশিরভাগ তরুণই উদ্যোক্তা হতে চায়। কিন্তু তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় না মূলতঃ অর্থের অভাবে। জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন তরুণের মধ্যে ৬ জনই উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় তারা সেই পথে এগোতে পারছেন না। অর্থাৎ আর্থিক সংকটই তাদের সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের বোঝায়, শুধুমাত্র উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা থাকলেই হবে না—প্রয়োজন সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ ও যথাযথ সহায়তা।
তারপরও সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য, বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর দক্ষতা থাকলে ব্যবসা হতে পারে এক বিস্ময়কর সাফল্যের গল্প। চ্যালেঞ্জ থাকলেও সুযোগের পরিধি অনেক বড়। তাই একজন তরুণ উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো—নিজের ভিতর আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, ধারাবাহিকভাবে শিখে যাওয়া এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা ধরে রাখা।
চাকরি বনাম ব্যবসা—সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ: চাকরি ও ব্যবসা—এই দু‘টি পথের মধ্যে পার্থক্য শুধু আর্থিক নয় বরং তা সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক চাহিদার সাথেও গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশে এখনো চাকরিকে সামাজিকভাবে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এমনকি সমাজও মনে করে একজন ব্যক্তি যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস ক্যাডার হতে পারে তবেই সে সফল। ফলে অনেক তরুণ নিজের স্বপ্ন ও সৃজনশীলতা বিসর্জন দিয়ে নিরাপদ চাকরির পথ বেছে নেয়, যদিও ভেতরে ভেতরে তার হয়তো ব্যবসা করার আগ্রহ ছিল।
চাকরি সাধারণত একটি স্থির কাঠামোর মধ্যে কাজ করার সুযোগ দেয়। যেখানে বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক স্বীকৃতি নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত থাকে। এই কাঠামো মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারে, বিশেষ করে যারা ঝুঁকি নিতে চান না তাদের জন্য। তবে এই নিরাপত্তার পেছনে অনেক সময় স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং নিজস্ব ভাবনার বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে ব্যবসার জগৎ অনেক বেশি স্বাধীন এবং উদ্ভাবনী হতে পারে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়া, নতুন কিছু শুরু করার উত্তেজনা, সমাজে কর্মসংস্থান তৈরি করার গর্ব—এসব কিছুই একজন উদ্যোক্তাকে মানসিকভাবে তৃপ্তি দেয়। তবে ব্যবসার ঝুঁকিও বেশি। লাভ-লোকসানের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা, মূলধনের সংকট এবং বাজারের চ্যালেঞ্জ অনেককে পিছিয়ে দেয়। পরিবারও অনেক সময় চায় না সন্তান অনিশ্চিত পথে পা রাখুক। ফলে বহু তরুণ ব্যবসা করার সাহস পেলেও পরিবেশগত বাধায় পিছিয়ে যায়।
তবে আশার কথা হলো—এই দৃশ্যপট এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসছে। ফেসবুক পেইজ, ইউটিউব চ্যানেল, হোম ডেলিভারি ভিত্তিক অনলাইন স্টোর কিংবা গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন—এইসব ক্ষেত্র থেকে হাজারো তরুণ নিজের পরিচিতি ও আয়ের পথ তৈরি করে নিচ্ছে। এতে করে ধীরে ধীরে সমাজ ব্যবসাকে সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করেছে।
সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাকরি স্থিরতা দিলেও ব্যবসা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীলতাকে উসকে দেয়। ফলে কার জন্য কোন পথটা ভালো হবে সেটা নির্ভর করে তার মানসিকতা, ঝুঁকি গ্রহণের মানসিক প্রস্তুতি এবং লক্ষ্য কী তার ওপর।
নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ও তরুণদের করণীয়: বাংলাদেশে তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা বিকাশে সরকারি পর্যায়ে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রকল্প, যুব ঋণ কর্মসূচি, ডিজিটাল উদ্যোক্তা ফোরাম, SME ফাউন্ডেশন বা আইডিয়া প্রকল্পের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, সেগুলোর সুফল এখনো অনেক তরুণের কাছে পৌঁছায় না। মূলতঃ তথ্য ঘাটতি, জটিল প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব এই উদ্যোগগুলোকে অনেকটাই অদৃশ্য করে রেখেছে।
অন্যদিকে চাকরির বাজারেও সংকট বাড়ছে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া লাখো তরুণের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান পেতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। শুধু সার্টিফিকেট নয় বরং দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার ভিত্তিতে চাকরির মূল্যায়ন হওয়া দরকার। কারিগরি ও ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তুত হতে পারে।
এখনকার তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা এবং বাস্তবতা বোঝা। চাকরি না ব্যবসা, এই প্রশ্নের উত্তর এককভাবে নির্ধারণযোগ্য নয়। কেউ চাকরিতে সফল, কেউ ব্যবসায়—তবে তার আগে নিজেকে জানতে হবে, নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে, আর সময়ের চাহিদা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একইসাথে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে তরুণরা ঝুঁকি নিতে সাহস পায়, আর উদ্যোক্তা হতে চাইলেই যেন তাকে একা পথ হাঁটতে না হয়। তরুণরা শুধু “চাকরির খোঁজে’ নয়, বরং ‘চাকরি দেওয়ার মতো” অবস্থানে যেতে পারলে, তবেই একটি টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে উঠবে।
চাকরি ও ব্যবসা—এই দু‘টি পথের মধ্যে কোনটি ভালো, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। সিদ্ধান্তটা নির্ভর করে একজন তরুণের ব্যক্তিগত আগ্রহ, দক্ষতা, মানসিকতা এবং জীবন-বাস্তবতার ওপর। কেউ হয়তো নিয়মিত আয় ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে চাকরির পথ বেছে নেবে, আবার কেউ স্বাধীনভাবে চিন্তা করে ঝুঁকি নিতে পছন্দ করবে, সে ব্যবসার দিকে ঝুঁকবে।
তবে যেটাই বেছে নেওয়া হোক না কেন, বর্তমান সময়ে শুধু ডিগ্রি নয় দরকার বাস্তব দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত তরুণদের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। তরুণদের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি পরিকল্পিতভাবে পথ চলা যায় তবে তারা শুধু নিজের নয়, দেশের ভবিষ্যৎও গড়ে তুলতে পারবে।

