জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি জানান, কর ফাঁকি কমাতে প্রথম ধাপে তামাক খাতে কঠোর নজরদারি শুরু করা হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে পরে একই পদ্ধতি অন্যান্য খাতেও প্রয়োগ করা হবে।
গতকাল শনিবার (১৬ মে) ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা ভবনের সেমিনার কক্ষে প্রাক বাজেট সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। “রাজস্ব সংগ্রহ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা” শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।
চেয়ারম্যান বলেন, তামাক শিল্পকে আরও কঠোর ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। উৎপাদন পর্যায়ে কাউন্টিং মেশিন, ক্যামেরা, কিউআর কোড এবং উন্নত রাজস্ব স্টিকার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সফল বাস্তবায়নের পর এই প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি অন্যান্য পণ্যে সম্প্রসারণ করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে বাজেটে কিছু নতুন ক্ষেত্র যুক্ত হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
করদাতার হয়রানি কমাতে রাজস্ব প্রশাসনকে “সামনাসামনি বিহীন” ব্যবস্থায় রূপান্তরের ওপর জোর দেন তিনি। তার ভাষায়, করদাতারা যেন ঘরে বসেই নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। হয়রানিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “হয়রানি দূর করার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো ব্যবস্থাকে সামনাসামনি বিহীন করা।”
তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়। কর কাঠামোয় পরিবর্তনের কাজ চলছে এবং উচ্চ পর্যায়ে সব কর প্রস্তাব নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
আসন্ন বাজেটে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা ও রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গঠনের পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে।
সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, কর সংস্কারকে কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এটি মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে কর সংস্কার প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ নির্ভর হওয়ায় দেশ একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্য অবস্থায় আটকে আছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহি ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া কার্যকর কর সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর জন্য দায়ী বিশেষ সুবিধা নির্ভর কর ছাড় ব্যবস্থা। প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার কারণে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সংকটের মূল কারণ কাঠামোগত। এর মধ্যে রাজনৈতিক অর্থনীতি, কর অব্যাহতি ব্যবস্থা, অনিয়মতান্ত্রিক চর্চা এবং দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার অন্যতম। তিনি আরও বলেন, কর সংস্কারকে শুধু নীতিমালার নকশায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা, ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সংলাপে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার কারণ, করনীতি সংস্কার, রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক, সামাজিক উন্নয়নে রাজস্ব নীতির প্রভাব এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

