আগামী বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে। যা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের বড় অঙ্কের ঋণগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘জলবায়ুর চাপ পরীক্ষা: বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য একটি গবেষণা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করল। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের এখনই সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আনতে পারে, যার প্রভাবে জিডিপি কমে যাবে এবং বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যাঘাত ঘটবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে ব্যাংক খাতের ঋণ শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পানির সংকট, অতিবৃষ্টি, খরা ও তাপপ্রবাহের ঘটনা বেড়েছে। কখনও কখনও অতিরিক্ত শীতও দেখা দিচ্ছে। এসব পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ সরাসরি কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের একটি বড় অংশ কৃষি খাতে বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদনে এ ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ঋণ আদায়ে সমস্যা তৈরি হবে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে কৃষি খাতে ঋণ প্রদানের সময় জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে বিকল্প তহবিল গঠনের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
গবেষণায় অর্থনীতিভিত্তিক স্যাটেলাইট মডেল প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমলে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকির মাত্রাও বেড়ে যায়। উৎপাদন কমে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হ্রাস পায় ফলে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। এতে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং ব্যালেন্স শিট দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, জলবায়ুর কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রভাব এখনই বিবেচনায় নিয়ে দেশের আর্থিক খাতসহ সকল খাতকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্টেকহোল্ডারদের সচেতন করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, এই নেতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে বৃহত্তর ঋণ ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। বড় অঙ্কের ঋণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ওপর সরাসরি আঘাত হানবে এবং এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়বে পুরো ব্যাংক খাতে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

