একটি দেশের ব্যবসার পরিবেশ কতটা সহায়ক, তা নির্ভর করে নানা বিষয়ের উপর—যেমন: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কাঠামো, আইন-কানুন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। এসব উপাদান মিলে গড়ে তোলে একটি দেশ বা অঞ্চলে ব্যবসা গড়ে তোলার ও পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ।
আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে যে কোনো দেশের জন্য একটি শক্তিশালী ও উদ্যোক্তা-বান্ধব ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও সেই লক্ষ্যেই শিল্প উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে নানা ধরনের নীতিমালা গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তবে ব্যবসা শুরু করা বা পরিচালনা করা এখনো সহজ নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং অর্থপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা অনেক ব্যবসায়ীকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল আগ্রহ ও উদ্ভাবনী চিন্তা। কিন্তু তারা যখন কর কাঠামো, ঋণের জটিলতা বা সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘ সময়ের মুখোমুখি হন তখন হতাশা জন্ম নেয়।
বিশ্বব্যাংকের “ইজ অব ডুয়িং বিজনেস” সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। কিন্তু সেই সূচকের বাইরেও দেশের ব্যবসায়ীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে দেয় আমাদের এখানে ব্যবসা করা কতটা চ্যালেঞ্জিং। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এখন সময় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব খোঁজার—এই দেশে ব্যবসার পরিবেশ আদৌ কতটা সহায়ক এবং তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে কীভাবে প্রভাবিত করছে।

ব্যবসার পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? ব্যবসার পরিবেশ বলতে বোঝায়—একটি দেশ বা অঞ্চলে কেউ কতটা সহজে, স্বচ্ছভাবে ও কার্যকরভাবে ব্যবসা শুরু করতে, পরিচালনা করতে এবং প্রয়োজনে সম্প্রসারণ বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেই সামগ্রিক পরিস্থিতি। এই পরিবেশ ব্যবসার চারপাশে থাকা নানা ধরনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। যা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে একটি ব্যবসাকে প্রভাবিত করে।
একটি ব্যবসার জন্ম থেকে শুরু করে তা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আইনগত কাঠামো, করনীতি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা বা সরলতা, অবকাঠামোগত সুবিধা, আর্থিক সহায়তার সুযোগ, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এসব বিষয় ব্যবসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ এবং কৌশল গঠনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
এছাড়াও অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন: মুদ্রাস্ফীতি বা বেকারত্ব, প্রযুক্তির অগ্রগতি, গ্রাহকের চাহিদা ও সামাজিক মূল্যবোধ, এমনকি আবহাওয়া ও জলবায়ুর মতো উপাদানও ব্যবসার পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে মালিক ও কর্মচারীদের দক্ষতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। যেটি একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে গঠন করে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতা, বাজারের গতিপ্রকৃতি ও গ্রাহকের আচরণ বাহ্যিকভাবে ব্যবসার দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে।
সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ হলো এমন এক জটিল ও পরস্পর সংযুক্ত উপাদানের সমষ্টি, যা ব্যবসার গতি ও গুণগত মান নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই পরিবেশ যদি সহায়ক ও স্থিতিশীল হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যবসার জন্যই নয় বরং পুরো দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনে।
বাংলাদেশে ব্যবসার সূচনার শুরুতেই জট: বাংলাদেশে নতুন করে একটি ব্যবসা শুরু করতে চাইলে উদ্যোক্তাকে শুরুতেই নানা রকম জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ব্যবসা শুরু করার প্রাথমিক ধাপ যেমন: কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) এবং ভ্যাট নিবন্ধন—এসব কাজের জন্য একাধিক দপ্তরে যেতে হয়। আর প্রতিটি ধাপেই সময়, শ্রম ও খরচের হিসাব বাড়ে।
যদিও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু করেছে যেমন: অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন, অনলাইন ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি। তবে এসব সেবার বাস্তব প্রয়োগ এখনও অনেকাংশে সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ঠিকভাবে কাজ করছে না, সার্ভার সমস্যায় তথ্য জমা দেওয়া যাচ্ছে না বা আবার বারবার অফিসে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল সেবা থাকলেও বাস্তব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকেই।
অন্যদিকে এসব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার অফিস, সিটি কর্পোরেশন, বা ইউনিয়ন পরিষদে ট্রেড লাইসেন্স নিতে গিয়ে ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের অভিযোগ এখনও বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে গড়ে সময় লাগে ২০ দিনের বেশি। যেখানে প্রতিবেশী অনেক দেশে এই সময় অর্ধেকেরও কম।
এছাড়াও উদ্যোক্তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত “ওয়ান-স্টপ সার্ভিস” বা এক জায়গায় সব সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা। যদিও এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে কর্তৃপক্ষ। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করাই হয়ে উঠছে একপ্রকার মানসিক চাপ এবং সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ব্যবসার প্রতি আগ্রহ বাড়লেও এই প্রাথমিক ধাপগুলোতে সুবিধা না থাকায় অনেকেই মাঝপথেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। যদি উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়ন করা না যায় এবং প্রাথমিক ধাপগুলোর জটিলতা দূর না হয়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।
সরকারি সহায়তা—ঘোষণায় জোর, বাস্তবে দুর্বলতা: ব্যবসায়িক পরিবেশকে সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করার লক্ষ্যে সরকার “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” (OSS) চালু করেছে। যাতে একজন উদ্যোক্তা এক জায়গা থেকেই সব ধরনের অনুমোদন, রেজিস্ট্রেশন ও পরামর্শ পেতে পারেন। তত্ত্বে এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও বাস্তবে এর সুফল খুব কম সংখ্যক উদ্যোক্তাই পাচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত এই সেবার আওতায় সম্পূর্ণ অনলাইনে প্রক্রিয়া শেষ করার সুযোগ নেই। ফলে ব্যবসার অনুমোদন বা ছাড়পত্র নিতে অনেক সময় মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিতে গিয়ে ভোগান্তির অভিজ্ঞতা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিসিক, বিজিএমইএ বা এলডিসি খাতের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা প্রায়ই জানান, “নির্দিষ্ট অফিসে ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না”। এই অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এখনো ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যা কেবল ব্যবসার ব্যয়ই বাড়ায় না বরং একটি নীতিহীন ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রণোদনা, করছাড়, সহজ ঋণের ঘোষণা দেয় ঠিকই কিন্তু সেই সুবিধাগুলো কার্যতঃ কতজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায়—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক সময় এই সুবিধা পেতে হলে এমন সব জটিল কাগজপত্র ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, যেগুলো নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বড় প্রতিষ্ঠান বা ভালো যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিরাই মূলতঃ এসব সরকারি সহায়তার সুবিধা পান।
সরকারি প্রকল্প ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে তথ্যের স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব এখনো প্রকট। সরকারি দপ্তরগুলোতে ডিজিটাল রূপান্তরের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে অনেক কিছুই এখনো পুরনো পদ্ধতিতেই চলছে। যেখানে কাগজের ফাইল, সুপারিশ এবং ‘ধৈর্য’ সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।
এই বাস্তবতায় অনেক উদ্যোক্তার মধ্যেই একটি হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে সরকার ব্যবসায় সহায়তার কথা বললেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। ঘোষণার ভাষা যতটা উৎসাহ জাগায়, মাঠপর্যায়ের চিত্র ততটাই নিরুৎসাহজনক। যদি এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দ্রুততা ও সদিচ্ছা না আসে তবে দেশের ব্যবসা পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অবকাঠামো ও লজিস্টিক সাপোর্ট ব্যবসার পালে হাওয়া না বাঁধার দেয়াল? বাংলাদেশে ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে যত কথাই হোক না কেন, অবকাঠামো ও লজিস্টিক খাতের বাস্তবতা থেকে কেউ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। বিগত এক-দেড় দশকে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও বন্দরের পরিকাঠামোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প যেমন: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের বার্তা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই উন্নয়ন কি ব্যবসার প্রকৃত চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে?
চট্টগ্রাম বন্দরের জটিলতা এখনো ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। পণ্য খালাসে সময় লাগে গড়ে ৪-৬ দিন। যা অনেক আন্তর্জাতিক বন্দরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। তদুপরি বন্দর থেকে রাজধানী কিংবা দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ—উভয়ই বাড়ছে। যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা, সীমিত সংখ্যক ট্রাক ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অকারণে সময় অপচয় হয়।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত যেটি দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আনে, সময়মতো পণ্য ডেলিভারির অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। একাধিক গার্মেন্টস মালিক জানিয়েছেন,“সময়মতো পণ্য না পৌঁছালে বিদেশি ক্রেতা অন্য দেশে চলে যায় কারণ তারা অপেক্ষা করতে চান না”।
এছাড়া দেশের শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহও অনেক সময় অনিয়মিত। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ থাকলেও সন্ধ্যার পর হঠাৎ লোডশেডিং অথবা কারখানার উৎপাদনের সময় গ্যাসচাপ কমে যাওয়া, এসব এখনো বাস্তব সমস্যা। ইন্টারনেট সুবিধা শহরে মোটামুটি হলেও জেলা শহর বা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই এটি ভরসার জায়গা নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি এখনও ব্যবসার গতিকে থমকে দিচ্ছে। অর্থাৎ অবকাঠামো আছে কিন্তু তা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবসাকে সহায়তা করতে পারছে সেই প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসাবান্ধব অবকাঠামো বলতে কেবল বড় বড় প্রকল্প নয় বরং সময়মতো, নিরবচ্ছিন্ন এবং নির্ভরযোগ্য সেবা বুঝায়। তাই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে লজিস্টিক সেবার গুণগত মানও বাড়ানো জরুরি।

বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনার মাঝেও সংকোচ: বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে “সম্ভাবনার দেশ” হিসেবে পরিচিত হলেও বিদেশি বিনিয়োগের বাস্তব চিত্র সেই আশাবাদের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। একটি দেশের ব্যবসার পরিবেশ যত স্বচ্ছ, স্থিতিশীল এবং আধুনিক হয়, ততই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ে। তবে বাংলাদেশে এখনও এমন কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা এই আগ্রহকে বারবার বাঁধাগ্রস্ত করছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI -Foreign Direct Investment) শুধু টাকার যোগানই দেয় না—এর সঙ্গে আসে প্রযুক্তি, দক্ষতা, বাজার সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পূর্বের বছরের তুলনায় কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর মেয়াদে দেশের আর্থিক হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে তার আগের মাসগুলো অর্থাৎ জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত এই ঘাটতি ছিল ৪ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যানই দেখায় যে বিদেশি বিনিয়োগের গতি কমে গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে মোট নেট এফডিআই ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০২২ সালে ছিল ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কমে গেছে। এই হ্রাসের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যাও। যেমন: বিনিয়োগ-সম্পর্কিত অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, নীতির স্থিতিশীলতার অভাব এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আয় দেশে থেকে বিদেশে পাঠানোর কঠিন প্রক্রিয়া।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব কারণকে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে এখনও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো তাদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করছেন। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ এবং মুডি’স বলেছে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং ডলারের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ডলার সংকটের কারণে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের লভ্যাংশ দেশান্তর করতে না পারায় নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা দ্বিধান্বিতায় ভুগছেন।
অন্যদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রগতি থাকলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, রোড নেটওয়ার্ক এবং বন্দরের সক্ষমতা ব্যবসার নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। অথচ এখনও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের জন্য বছর বছর অপেক্ষা করছে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল পরিকাঠামোতেও এখনও অনেক জায়গায় ঘাটতি রয়ে গেছে।
ব্যবসার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স ফাইলিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে জটিলতা ও দুর্নীতির অভিযোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে একটি ব্যবসার অনুমোদন না পেলে তা সরাসরি অন্য দেশে চলে যায়। এক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, ভারত বা ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে উঠে আসছে। কারণ তারা তুলনামূলকভাবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে।
এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য, সহজ, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, ডলার লেনদেনে শিথিলতা আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হ্রাস—এই কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
সর্বোপরি বিনিয়োগকারীরা ‘আশ্বাস’ নয়, ‘বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা’ খোঁজে। সেই বিশ্বাস অর্জনে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এখন আরও বেশি দায়িত্বশীল ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ: বাংলাদেশের ব্যবসা খাতে সবকিছু যে শুধু নেতিবাচক তা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন দেশের ব্যবসা পরিবেশে আশার সঞ্চার করেছে। ব্যবসা শুরু করতে একটি নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক, যাকে বলা হয় ‘বিন’ (Business Identification Number)। আগে এটি পেতে নানা ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো উদ্যোক্তাদের। এখন এই প্রক্রিয়াটি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে একজন উদ্যোক্তা দ্রুত ও অনলাইনে এই নম্বর পেতে পারেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA-Bangladesh Investment Development ) তাদের এক স্টপ সার্ভিস (OSS-One Stop Service) প্ল্যাটফর্মকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করছে। উদ্যোক্তাদের একাধিক দপ্তরে না ঘুরে এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যদিও এর পুরোপুরি সুফল পেতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে। তবুও এটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকগুলোতে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু হয়েছে যেখানে তুলনামূলকভাবে কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং প্রদর্শনী আয়োজনের পরিমাণও বেড়েছে। এই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে গ্রামাঞ্চলেও ছোট ছোট ব্যবসার প্রসার ঘটছে। আগের মতো নগদ লেনদেনের ঝামেলা কমে আসছে, ফলে নিরাপদ এবং দ্রুত লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা মানুষকে ব্যবসার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
স্থানীয় উৎপাদন খাতেও ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রপ্তানিমুখী পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার নানা ধরনের সহায়তা ও প্রণোদনা দিচ্ছে, যাতে দেশীয় শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জায়গা করে নিতে পারে। কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি আগের তুলনায় বাড়ছে যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে।

করণীয়: তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব উন্নতিতে রূপ দিতে হলে আরও কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। পদক্ষেপ গুলো হলো-
*ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াটি একেবারে সরল ও ঝামেলাহীন করতে হবে। যাতে একজন নতুন উদ্যোক্তা সহজেই নিজ ব্যবসা শুরু করতে পারেন। কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও হয়রানিমুক্ত করা দরকার। যাতে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে।
*ব্যাংকিং সেক্টরে জামানতবিহীন প্রাথমিক ঋণের সুযোগ চালু করলে নতুন উদ্যোক্তারা বিশেষ করে তরুণরা উৎসাহ পাবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে দক্ষতা ও আধুনিকতা বাড়ানো গেলে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে, যা ব্যবসার গতিশীলতা বাড়াবে। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ স্টার্টআপ ফান্ড ও কর রেয়াতের সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
*দেশের প্রতিটি জেলায় উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা সেন্টার চালু করা হলে গ্রামীণ অঞ্চলের তরুণরাও উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস পাবে। আর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত স্বচ্ছতা, দ্রুত অনুমোদন এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে লাভ উত্তোলনের নিশ্চয়তা। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে একটি উদীয়মান বিনিয়োগবান্ধব দেশে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে ব্যবসা করার পরিবেশে যেমন একদিকে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, তেমনি অপরদিকে আছে সম্ভাবনার দ্বারও। প্রশাসনিক জটিলতা, কর ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক বাঁধা এখনো বিদ্যমান। তবে ডিজিটাল পেমেন্ট, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, স্থানীয় শিল্পে রপ্তানি প্রণোদনা ও ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে এমন এক স্টপ সার্ভিসের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আশা জাগায়।
এই প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত, বাস্তবভিত্তিক ও উদ্যোক্তাবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে। সুশাসন, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ শুধু সহায়কই নয়—আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে দেশি-বিদেশি সকল বিনিয়োগকারীর জন্য।

