করোনা মহামারি, বৈশ্বিক মন্দা, কাঁচামালের সংকট আর মূল্যস্ফীতির চাপ পেরিয়ে বাংলাদেশের জুতা শিল্প ২০২৫ সালের শুরুতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রফতানিতে প্রবৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ক্রেতা আস্থার প্রত্যাবর্তন—এই চারটি দিক খাতটিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের জুতার বাজার নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় বার্ষিক বাজার মূল্য ধরা হচ্ছে অন্তত ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ আসে ব্র্যান্ডেড পণ্য থেকে। বাকি অংশে রয়েছে স্থানীয়, নন-ব্র্যান্ডেড এবং আমদানি করা জুতা।
একইসঙ্গে, প্রতিবছর প্রায় ১১১ কোটি ডলারের জুতা রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় ব্র্যান্ডের উত্থান এবং চামড়াজাত ও সিন্থেটিক পণ্যের রফতানিতে ধারাবাহিক অগ্রগতি বাংলাদেশকে রফতানি মানচিত্রে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও এলএফএমইএবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে চামড়ার জুতা রফতানি বেড়েছে ২৫.২৪ শতাংশ। এই সময়ে আয় হয়েছে ৪৯৬.১৭ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সিন্থেটিক ও স্পোর্টস জুতার রফতানি বেড়েছে ৩৪.১৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৪১৪.৬৮ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) জুতা রফতানি থেকে এসেছে ৬২৬.৫ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৩৪.৩০ শতাংশ। এর মধ্যে চামড়ার জুতা থেকে এসেছে ৩৫২.৬৫ মিলিয়ন ডলার এবং নন-লেদার জুতা থেকে ২৭৩.৯ মিলিয়ন ডলার।
বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিকারক চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ক্রয়াদেশ অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা। তারা নতুন গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশকে। এর ফলে দেশি খাতটিতে রফতানির গতি বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলারের জুতা। এর মধ্যে চামড়াবিহীন (নন-লেদার) জুতা থেকেছে সবচেয়ে বেশি আয়—৪১৬.৮ মিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নন-লেদার জুতার রফতানি ছিল ২৭ কোটি ডলার। তা বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে হয় ৪৫ কোটি ডলার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২২-২৩ সালে কিছুটা পতন ঘটলেও বর্তমানে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, গুণগত মান ও টেকসই পণ্যের কারণে ভবিষ্যতে রফতানি ১০০ কোটির ঘর ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ শুধু রফতানিকারক নয়, একটি বড় ভোক্তা বাজারও। ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ৩৫ কোটি জোড়া জুতার চাহিদা ছিল। ভোক্তার সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম বাজার। শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে বিক্রির হার বেড়ে যায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। অ্যাপেক্স চলতি ঈদে এনেছে ২,৫০০ নতুন ডিজাইনের জুতা। তাদের ৫০৬টি শোরুম রয়েছে। প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘ভ্যানচুরিনি’ এনেছে ৫০ হাজার টাকার হ্যান্ডমেড জুতা। অন্যদিকে বাটা এনেছে ১,০০০ ডিজাইন। তাদের শোরুম সংখ্যা ২২২টি। বাটার শোরুম ম্যানেজার জানান, এবার বিক্রি আগের বছরের তুলনায় বেশি।
২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে অ্যাপেক্স আয় করেছে ৫৪০ কোটি টাকা, বাটা আয় করেছে ৩৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু মুনাফায় বড় ব্যবধান বাটা ৩৭ কোটি টাকা, অ্যাপেক্স: ৯৭ লাখ টাকা। এর পেছনে রয়েছে মূলত উৎপাদন খরচ ও সুদের ব্যয়। বাটার উৎপাদন খরচ: ৫৪%, অ্যাপেক্সের উৎপাদন খরচ: ৭৭%, সুদ খরচ: বাটা ৬ কোটি, অ্যাপেক্স ১৫ কোটি অ্যাপেক্সের এএমডি দিলীপ কাজুরি বলেন, “আমরা নিজস্ব কারখানা ও জনবল ব্যবস্থাপনায় কাজ করি। মান বজায় রাখতে গিয়ে খরচ বেশি হয়।” ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যায়—অ্যাপেক্সের ব্যবসা বেশি, কিন্তু মুনাফায় পিছিয়ে।
২০২৪ সালে বাটা কর ও শুল্ক বাবদ দিয়েছে ২৮১ কোটি টাকা। টানা সাত বছর ধরে তারা খাতের সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে নতুন ব্র্যান্ডও। টি কে গ্রুপের ‘রিফ ফুটওয়্যার’ চালু করেছে ৫টি বিক্রয়কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জানান, “বিক্রি বেড়েছে ১৫-২০ শতাংশ।” বিশ্বের জুতা বাজারের আকার প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। এর অর্ধেকই চীনের নিয়ন্ত্রণে। বিকল্প জোগানদাতার সন্ধানে রয়েছে অনেক দেশ। বাংলাদেশের সামনে বড় সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ৫০টির বেশি দেশে জুতা রফতানি করছে—যেমন: ভারত, দুবাই, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইটালি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে জুতা খাত হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী রফতানি-নেতৃত্বাধীন খাত

