চলতি মৌসুমে দেশে বোরো ধানের রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ টন ধান। অন্যদিকে, খাদ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ ২১ লাখ ৪৩ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৮ লাখ ৯৯ হাজার টন ও ধান ১ লাখ ১ হাজার টন।
দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। সেই হিসাবে উৎপাদন ও মজুদে ঘাটতির কোনো কারণ নেই। তবু তিন মাস ধরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। প্রশ্ন উঠছে—এই অস্থিরতার পেছনে কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় তথ্যগত অসঙ্গতি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব বড় কারণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সময়মতো তথ্য দিলেও তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না। অনেক সময় পরিসংখ্যানে অতিরঞ্জন থাকে। একইভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তথ্য প্রকাশে বিলম্ব করে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়।
ফলে বাজারে আগাম প্রস্তুতির ফলও দেখা যায় না। তথ্যের অসামঞ্জস্য ও বাজার তদারকির ঘাটতিতে চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, সক্রিয় থাকে সিন্ডিকেট। এ অবস্থায় খাদ্য উৎপাদন, মজুদ ও সরবরাহ—তিন স্তরে নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
চাল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভোগ্যপণ্য। এর দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়ে। পরিবারগুলোর মাসিক খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশই চলে যায় চাল কিনতে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আমিষজাতীয় খাদ্য যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ কম খেতে বাধ্য হয়।
চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ভরা মৌসুমেই। কুষ্টিয়া ও নওগাঁর বাজারে গত জানুয়ারি থেকে শুরু হয় মূল্যবৃদ্ধি। এক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে ৬-৭ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। এরপর জুন-জুলাইতে দ্বিতীয় দফা বৃদ্ধি ঘটে। আঠাশ, বাসমতী ও কাজললতা চালের দাম উঠে ৫৮ টাকায়। মিনিকেট একপর্যায়ে বিক্রি হয় ৮৬ টাকায়, আর বাসমতী ৯২ টাকায়। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বেশি হলে দাম কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো। বোরোর উৎপাদন ও সরকারি মজুদ বিবেচনায় এ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। তারপরও বাজারে দাম বাড়ছে, কারণ কিছু মজুদদার ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে চাল ছাড়ছে না।
চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার নিজে ৪ লাখ টন চাল আমদানি করছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতে আরো ৫ লাখ টন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমদানির ঘোষণা আসার পর অনেক মজুদদার বাজারে চাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, ফলে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। এতে স্পষ্ট, বাজারে কৃত্রিম সংকটই তৈরি হয়েছিল।
এই অবস্থায় চাল আমদানিতে বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা বেশি থাকা উচিত। একই সঙ্গে বাজারে চালের সরবরাহ নিশ্চিত ও তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সিন্ডিকেটে লাভ, কৃষকে লোকসান
চাল মজুদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট নতুন কিছু নয়। এবারও সেই পুরোনো চিত্র। খাদ্য অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালালেও তেমন প্রভাব পড়েনি। এসব অভিযান অনেকটাই লোক দেখানো ছিল, প্রকৃত সিন্ডিকেট ধরার চেষ্টা হয়নি।
অন্যদিকে, কৃষক ধান বিক্রি করছেন কম দামে, অথচ ভোক্তাকে চাল কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। লাভ হচ্ছে কেবল মধ্যস্বত্বভোগী একটি শ্রেণীর। এই অবস্থা বন্ধ করতে হবে। খাদ্যব্যবস্থায় প্রকৃত তথ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা জরুরি, না হলে সামনে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে না। কৃষিজমি কমছে, নতুন জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের ঘাটতি, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও কৃষকের আয় কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে কৃষি খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে আবাদযোগ্য জমি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। একই সময়ে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে ৪ শতাংশ, আর চাল উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ।
এই অবস্থায় চাল আমদানি যৌক্তিক হলেও সেটি যেন নীতিনির্ধারকদের স্বস্তির জায়গা না হয়। বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

