বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এক গভীর সঙ্কটে পড়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ শতাংশে, যা অভূতপূর্ব ও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভুল নীতি এবং দুর্বল তদারকির কারণে এই সমস্যাগুলো গোপন থেকে গেছে। কিন্তু গত ৫ আগস্ট ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক ব্যবস্থার ভেতরের অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একদিকে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাওয়া, অন্যদিকে বিশাল মূলধন ঘাটতি সব মিলিয়ে পরিস্থিতি গুরুতর রূপ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি দুর্বল ইসলামিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একত্রিত করে একটি বড় ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। লক্ষ্য হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বড় কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন এবং এতে নিয়মিত সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যবস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত আমানতকারী ও করদাতাদের ওপর পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর বহু আমানতকারী টাকা তুলে নেওয়ায় এসব ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ব্যাংককে মোট ৩৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। অথচ তাদের সম্মিলিত অনুমোদিত মূলধন মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া জাতীয় নির্বাচন হলেও চলবে। পুনর্গঠনের পর এসব ব্যাংকের শেয়ার সরকারের হাতে থাকবে এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। ইতিমধ্যে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন একটি ইসলামী ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ার দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির চেষ্টা চলছে, যাতে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করা যায়।
গভর্নর আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও অন্তত ২০টি ব্যাংক যার মধ্যে সরকারি ব্যাংকও রয়েছে, একীভূত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আনার পরিকল্পনা হতে পারে। তবে দুর্বল কোনো ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরকারের নেই।
ঝুঁকির দিকগুলোতে সতর্কতা অপরিহার্য: দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামিক ব্যাংককে একীভূত করার কাজ শুধুমাত্র শাখাগুলোকে একত্রিত করার বিষয় নয়। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্যালান্সশিট, উচ্চ মাত্রার নন-পারফরমিং লোন (অকার্যকর ঋণ) এবং সন্দেহজনক সম্পদের সমন্বয়। যদিও দেশের গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১০ শতাংশ, কিন্তু অনেক বেসরকারি ইসলামিক ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ সরকারি রিপোর্ট থেকে অনেক বেশি।
যখন এসব ব্যাংক একত্রিত হবে, তখন তাদের উচ্চ হারানোর ঋণ ও মূলধন ঘাটতি এক জায়গায় জমা হওয়ায় নতুন প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এর ফলে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুত মূলধন দ্রুত কমে যেতে পারে এবং নতুন অর্থায়নের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে। এই ধরনের ঝুঁকি যথাযথভাবে বুঝে না নিলে, পরবর্তীতে করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা পড়তে পারে এবং আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
শুধু আর্থিক নয়, ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দিক থেকেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা মালিকানা কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি এবং ভিন্ন ভিন্ন শরীয়াহ বোর্ডের মতামতের কারণে অভ্যন্তরীণ শাসন ও শরীয়াহ কমপ্লায়েন্সে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে। যদি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে একত্রিত না হয়, তাহলে নতুন ব্যাংক শরীয়াহভিত্তিক নাম থাকলেও গ্রাহকদের আস্থা পেতে ব্যর্থ হতে পারে।
এছাড়া এত বড় সম্পদ এক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত হলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণ গ্রহণ ও ব্যবসায়িক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক বহুমুখিতা ও উদ্ভাবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নৈতিক ঝুঁকি। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরায় বড় অঙ্কের সরকারি মূলধন দিয়ে ‘রিসেট’ করলে ভবিষ্যতে অশৃঙ্খল পরিচালনা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদানের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে ‘বেইল-আউট সংস্কৃতি’ গড়ে উঠবে, যা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছেন যে, একীভূতকরণের ফলে চাকরি ক্ষতি হবে না এবং আমানতকারীরা নিরাপদ থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে শাখা পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। লেনদেনের বিলম্ব, অনলাইন সেবায় ব্যাঘাত এবং ঋণ অনুমোদনের ধীরগতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ না হলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী-এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত শাখার সংখ্যা ৭৭৯টি, যার মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শাখা রয়েছে ২২৬টি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮০টি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১১৪টি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১০৪টি এবং এক্সিম ব্যাংকের ১৫৫টি। এছাড়া এই ব্যাংকগুলোর মোট ৬৯৮টি উপশাখা, ৫০০টি এজেন্ট আউটলেট এবং ১ হাজার টি এটিএম বুথ রয়েছে।
যদি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হয়, তবে তাদের সম্মিলিত আমানতের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার এদের মধ্যে ৪৬ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত, যার গড় প্রায় ৭৩ শতাংশ। মোট প্রায় ১ হাজার ৪৬৫টি শাখা-উপশাখা ও ৫০০টি এজেন্ট আউটলেটে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ কর্মী কাজ করছেন।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো তিনটি ভিন্ন কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ও ভিন্ন সেবা নীতিমালা অনুসরণ করে। যদিও সব ব্যাংকই শরীয়াহভিত্তিক, তবে তাদের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে পার্থক্য রয়েছে। একীভূতকরণের ফলে এসব পার্থক্য মিটিয়ে কার্যকর সমন্বয় না হলে নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এছাড়া নৈতিক ঝুঁকিও প্রবল। নতুন ব্যাংকটি একটি নতুন আইনি সত্তা হলেও পুরনো অনিয়মের ইতিহাস মুছে যাবে না। এর ফলে এমন এক বিপজ্জনক precedent তৈরি হতে পারে, যেখানে দুর্নীতিপূর্ণ কার্যক্রম করেও কেউ শাস্তি ছাড়া বড় প্রতিষ্ঠানের অংশ হতে পারবে।
এই পাঁচটি ব্যাংকে অনিয়ম যেমন: ঋণজালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, মিথ্যা প্রতিবেদন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। মালিকপক্ষের যোগসাজশে এসব অনিয়ম বহুদিন ধরে চলছিল। একীভূতকরণের সময় এসব সমস্যা যেন নতুন প্রতিষ্ঠানে না ছড়ায়, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও সুশাসন প্রয়োজন।
বিকল্প পথ ও সুপারিশ: বাংলাদেশের দুর্বল ইসলামী ব্যাংকগুলো একীভূত করার ক্ষেত্রে সরল ও ঝুঁকিমুক্ত পন্থা নেওয়া জরুরি। এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-
প্রথমতঃ একীভূতকরণ ধীরে ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। এর জন্য প্রতিটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দায়িত্বের বিস্তারিত মূল্যায়ন (due diligence) এবং স্বচ্ছ অডিট সম্পন্ন করতে হবে। শুধু শাখাগুলো মিশিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজন হলে প্রথম দিকে এই ব্যাংকগুলোকে আলাদা ‘অক্সিলিয়ারি ইউনিট’ হিসেবে রাখা যেতে পারে, যতক্ষণ না তাদের আর্থিক অবস্থান পুরোপুরি সুস্থ হয়।
দ্বিতীয়ত: স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধানে জোর দিতে হবে। সকল লেনদেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ, অকার্যকর ঋণের পরিমাণ এবং শেয়ারহোল্ডারের বিনিয়োগ সম্পর্কে স্পষ্ট ও নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ সীমিত হয়।
তৃতীয়ত: শারীয়াহ কমপ্লায়েন্স নিয়ে একক ও সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে তা সমন্বয় করে একটি সাধারণ রূপরেখা গড়ে তুলতে হবে, যাতে নতুন একীভূত ব্যাংক শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের আস্থা বজায় রাখতে পারে।
চতুর্থতঃ নতুন ব্যাংককে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। SME খাত দেশের অর্থনীতির প্রাণ কেন্দ্র, তাই এদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও সুরক্ষিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে ‘ডিপোজিটার প্রোটেকশন ফান্ড’ বা স্থিতিশীলতা তহবিল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে একসাথে সব ব্যাংক একীভূত করার চেয়ে, প্রতিটি ব্যাংককে আলাদা আলাদাভাবে কৌশলগত পুনর্গঠন করা। প্রতিটি ব্যাংকে ‘টার্নঅ্যারাউন্ড ম্যানেজমেন্ট টিম’ গঠন করা উচিত, যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ও পরিচালন দুর্বলতা দূর করবে। পরবর্তীতে শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও সংস্কার প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় এই বোর্ডের সদস্যরা ঝুঁকি ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জটিলতা সম্পর্কে সচেতন নাও থাকতে পারেন। এর ফলে শরীয়াহ কমপ্লায়েন্সে গতি ও কার্যকারিতা কমে যায়।
একই সঙ্গে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে আগের সব অনিয়ম, দুর্নীতি ও বেআইনি কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট দোষীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, বড় আকারে একসাথে ব্যাংক একীভূত করা স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু এতে বাজারে অস্থিরতা, দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট ও সিস্টেমিক ঝুঁকি তৈরি হবে। এর চেয়ে ভালো হবে প্রতিটি ব্যাংককে স্বতন্ত্রভাবে ও ধাপে ধাপে পুনর্গঠন করা, যেখানে বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে এবং জবাবদিহি বজায় রাখবে। এভাবেই আমরা দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই করে তুলতে পারব, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

