বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। যদিও আমাদের অবদান বৈশ্বিক নিঃসরণের তুলনায় সামান্য, তবু আমরা আশা করছি তা বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। সেই লক্ষ্যে দেশের জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ছাদে সোলার সিস্টেম, যার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগে, এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য? লক্ষ্য পূরণের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, আমরা কি তা করতে পারব, নাকি বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত?
এবার আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে বর্তমান নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিস্থিতি। কোথায় আমরা আছি, এবং কোথায় পৌঁছাতে হবে—এটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নীতিমালার সঠিক সমন্বয় ছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীর আগ্রহ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মিলিত হলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে, যদি অর্থায়ন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাঁধা থাকে, তবে লক্ষ্য অর্জন পিছিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে যাত্রার অংশ হলেও তা সফল করতে হলে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবতা ও অর্থায়নের সঙ্গতি অপরিহার্য।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) জানিয়েছে, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা বর্তমানে ১৬২৫.৯৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ১২৪৫.৮৩ মেগাওয়াট, আর অফ-গ্রিড বা গ্রিডে সংযুক্ত নয় এমন প্রকল্পের সক্ষমতা ৩৮০ মেগাওয়াট। বিভিন্ন উৎসের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, ১৩৩১.৯৪ মেগাওয়াট। বায়ু শক্তি থেকে ৬২.৯ মেগাওয়াট, হাইড্রো বা পানিশক্তি ব্যবহার করে ২৩0 মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে ০.৬৯ মেগাওয়াট এবং বায়োম্যাস থেকে ০.৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ৩.৬ শতাংশ। ছোট প্রকল্প যেমন সোলার হোম সিস্টেম ও সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার অবদান মিলিয়ে মোট ক্ষমতা প্রায় ৫.৭ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লিনের হিসাব অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের জন্য বছরে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০৪০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বছরে বিনিয়োগ ১.৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হবে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) এর ‘ক্যাটালাইজিং রিনিউয়েবল এনার্জি ফাইন্যান্স ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৫৮৫১ মেগাওয়াট এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ১৬৫০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে সক্ষমতা মাত্র ১৫৫৯ মেগাওয়াট। ফলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে আরও ৩৮৩১ মেগাওয়াট, আর ২০৪০ সালের জন্য আরও ১০৬৫৫ মেগাওয়াট যোগ করতে হবে। তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ কাজ নয়।
বর্তমান সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণে বড় চ্যালেঞ্জ আছে। লক্ষ্য পূরণের জন্য শক্তিশালী সরকারি উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একসাথে প্রয়োজন। না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন পিছিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিকল্পিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এদিকে পাশের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি দেখাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ নজরকাড়া; ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তাদের মোট বিদ্যুতের ২৬ শতাংশ আসে সৌরবিদ্যুতির মাধ্যমে। ভারত প্রথমে ২০৩০ সালের জন্য ১৭৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরে তা বাড়িয়ে ৫০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করেছে এবং এখন নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে। ভিয়েতনাম ২০২০ সালে করোনাকালে ৯ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে। পাকিস্তানও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে এগিয়েছে; ২০২৪ সালে তারা ১৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে, যার বেশির ভাগ বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে।
বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং ডলার সংকটে আমরা দগ্ধ। জ্বালানি আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আমরা পর্যাপ্ত অগ্রগতি করতে পারিনি। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, অর্থ সংকট এবং দুর্বল নীতিমালা খাতের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। ছোট প্রকল্পও প্রযুক্তিগত ও কর্মক্ষমতা ঝুঁকি, উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং জামানত শর্তের কারণে থমকে থাকে। নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকগুলো বিশেষত ছোট প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখায় না। বিশেষ করে যদি সহজতর নীতিমালা এবং প্রণোদনা না দেওয়া হয়, বিনিয়োগ ধীর থাকবে। বিনিয়োগ না হলে, পরিবর্তিত লক্ষ্যও অর্জন সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক তুলনায় পিছিয়ে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে শক্তিশালী নীতি, প্রণোদনা এবং অর্থায়নের সমন্বয় অপরিহার্য। অন্যথায়, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভাবনাহীন হবে।
সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৈশ্বিকভাবে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ০.০৪৩ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে এর গড় খরচ অনেক বেশি, ০.০৯৮৮ মার্কিন ডলার প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা। দেশীয় হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ছিল ৬.০১ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ১১.৩৫ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১২ টাকা। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। নীতিগত কারণে বিনিয়োগে চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বিলুপ্ত করেছে। এরপর সরকারি ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দরপত্র আহ্বান করা হলেও সাড়া মেলেনি।
মূল বাধা হলো, ভবিষ্যৎ চুক্তিতে সরকারের ‘ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ নেই, যা বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত নিশ্চিত করবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হয়নি এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকারের ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট থাকা জরুরি। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। যেমন, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে; তেমনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর তহবিল গড়ে উৎপাদনকারীদের সময়মতো অর্থ সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিতে জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নতুন জমি অধিগ্রহণ ঝামেলাপূর্ণ হলেও সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে সমস্যা সমাধান সম্ভব। খাসজমি ও জলাভূমি ব্যবহারের যথাযথ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হলে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমানো যায়। প্রয়োজন পড়লে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল গ্রহণ করে জমি সংরক্ষণ ও ব্যবহার আরও কার্যকর করা সম্ভব। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আনুষঙ্গিক ব্যয় কমানো জরুরি। বর্তমানে ব্যাটারি স্টোরেজের খরচ কমেছে। এখন প্রয়োজন গ্রিড আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করা। গ্রিড-স্কেল নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো শুল্কমুক্ত হলেও ছোট প্রকল্প যেমন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে এখনও আমদানি শুল্ক রয়েছে। ইনভার্টারের শুল্ক কমানো হলেও এফআরপি ওয়াকওয়ে, মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ডিসি কেবলের মতো যন্ত্রাংশে উচ্চ শুল্ক প্রযোজ্য। এসব শুল্ক কমানো প্রয়োজন।
২০৩০ সালের পরিকল্পনা অর্জনের জন্য বর্তমান বার্ষিক ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকে চার থেকে ছয় গুণ করতে হবে। এ জন্য দেশ-বিদেশে পুঁজি সংগ্রহের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে। তবে বেসরকারি খাত যদি মুনাফা ও টিকে থাকার সম্ভাবনা না দেখে, বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে না। তাই যথাযথ বিনিয়োগ নীতিমালা ছাড়া লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সংক্ষেপে, জমি, শুল্ক এবং বিনিয়োগ নীতি—এই তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ সমাধান না হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হবে।

