শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দেশের একমাত্র সরকারি কাচ কারখানা উসমানিয়া গ্লাস শিট দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত এই কারখানার অবস্থা উদ্বেগজনক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক টাকার পণ্য উৎপাদনে খরচ হয়েছিল পাঁচ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খরচ আরও বেড়ে গেছে।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ—নয় মাসে কোম্পানি পণ্য বিক্রি করে মাত্র ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা আয় করেছে। এ সময় খরচ হয়েছে ৪৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, এক টাকা আয় করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ টাকা। উসমানিয়া গ্লাস শিট গত এক দশক ধরে লাভের মুখ দেখেনি। সর্বশেষ মুনাফা হয়েছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে, প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ১২ কোটি টাকা।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ৮১ হাজার বর্গফুট কাচ উৎপাদিত হয়েছে। সেই বছরে বিক্রি হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার কাচ, তবে খরচ ছিল ১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয়ের চেয়ে খরচ পাঁচ গুণ বেশি। করোনা মহামারির সময় ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন শূন্য এবং লোকসান ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। গত দশ বছরে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে বছরে ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাচ উৎপাদনে খরচের মাত্র ৬৬ শতাংশই আয়ের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে। ওই পাঁচ বছরে খরচ হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা, বিক্রি হয়েছে ৬৯ কোটি টাকার কাচ। এক টাকা আয়ের জন্য খরচ পড়েছে দেড় টাকা।
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড (ইউজিএসএফএল) চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ১৯৫৯ সালে সাদা গ্লাস শিট উৎপাদন শুরু করে। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এটি দেশে একমাত্র গ্লাস শিট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। এরপর বেসরকারি খাতে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় উসমানিয়ার বাজার কমে যায়। ২০২৩-২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএইচপি, নাসির, আকিজ ও এবি গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নত মানের কাচ উৎপাদন করছে। পাশাপাশি বৈদেশিক পণ্যের সহজলভ্যতা বাজারে চাপ বাড়িয়েছে।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “আমরা যে নকশার কাচ তৈরি করি, এখন আর সেটির চাহিদা নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও আমাদের মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে নেই। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়।” কারখানার মূল সমস্যা হলো পুরোনো যন্ত্রপাতি ও অনুন্নত প্রযুক্তি। ২০১৯ সালে একটি ফার্নেস বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের জুনে অগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় ফার্নেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে উৎপাদন শুরু হলেও ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় ফার্নেসের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। কর্মকর্তারা জানান, টানা ১০-১১ বছর ধরে লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ হলেও ধারদেনা করে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা অবসরে চলে গেছেন, কেউ কাউকে বিসিআইসির অন্য অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে। পুরোনো প্রযুক্তি বদল না করলে লাভের আশা নেই।
দুই বছর ধরে কারখানা বন্ধ। পণ্য বিক্রি থেকে আয় নেই। কোম্পানি উৎপাদনের জন্য আনা কাঁচামাল ও পুরনো যন্ত্রপাতি বিক্রি করছে। সামান্য আয় এখান থেকেই আসে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়ের ৪৫ শতাংশ খরচ হয় বেতন-ভাতায়। প্রতি বছর গড় ব্যয় প্রায় এক কোটি টাকা। বর্তমানে ১০৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের বেতন বিসিআইসির ঋণ থেকে দেওয়া হচ্ছে। ৩০ জুন পর্যন্ত বিসিআইসি থেকে নেওয়া ঋণ ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে কোম্পানির দায় প্রায় ৬১ কোটি টাকা। লোকসান থাকা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর বেতন ছাড়াও বোর্ড সভার জন্য সম্মানী দেয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭টি সভার জন্য প্রত্যেক পরিচালক পেয়েছেন ৬ হাজার টাকা। এই সময়ে ৩৭টি সভায় সম্মানীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। হিসাব ও অর্থ বিভাগের প্রধান আবদুল মজিদ জানান, আপাতত বিসিআইসি ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আনিসুজ্জামান বলেন, “কারখানা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান প্রযুক্তিতে চালু করলে লাভ হবে কি না অনিশ্চিত। ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়া তেমন সমস্যা তৈরি করছে না। সূত্র:সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)

