ঢাকার কেরানীগঞ্জের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিন অল্প অল্প করে আয় থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা জমিয়ে মাস শেষে সেই টাকা ব্যাংকে রাখেন। রাজশাহীর এক কৃষিশ্রমিক মৌসুম শেষে কয়েক হাজার টাকা সঞ্চয় করে ব্যাংক হিসাব খোলার পরিকল্পনা করেন। ময়মনসিংহের এক গৃহকর্মী তার সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ছোট একটি সঞ্চয় পরিকল্পনা করতে চান। তাদের কারও আয় করযোগ্য নয়, কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই।
কিন্তু আগামী দিনে ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে এসব সাধারণ মানুষের জন্যও ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষার্থী হিসাবসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় সব ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, করের আওতা বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন যুক্ত থাকলে আয় ও সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণ সহজ হবে এবং কর ফাঁকি শনাক্ত করাও কার্যকর হবে।
বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি তথ্যভান্ডার ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো ৫৭ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। মাত্র ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যাংক বা আর্থিক হিসাব রয়েছে। যেখানে বিশ্ব গড় ৭৩ থেকে ৭৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে সরকার যখন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই নতুন শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। এদের বড় অংশের কোনো করযোগ্য আয় নেই। তবে নিরাপত্তা, সঞ্চয় বা জরুরি প্রয়োজনে তারা ব্যাংকিং সেবার ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নো-ফ্রিলস ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ৩ কোটি ৪২ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব হিসাবে জমা হয়েছে ৭ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বেশি। এতে দেখা যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ছে। তবে নতুন শর্ত সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যত সহজ হবে, তত বেশি মানুষ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। তার মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্ত আরোপ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। তবে নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪৬ লাখ মানুষ অর্থাৎ বড় একটি অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এর মধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে টিআইএন নিয়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে।
তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্যোগকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। সেটিকে ব্যবস্থার মধ্যে আনতে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে টিআইএন থাকা মানেই কর দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, শুরুতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সরকারের দায়িত্ব হলো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা, যাতে মানুষ মনে না করে টিআইএন থাকলেই কর দিতে হবে।
তবু বাস্তবে ভয়ের প্রভাব স্পষ্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, তার আয় করযোগ্য নয়, তাই তিনি কর দেন না। কিন্তু ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলে ভবিষ্যতে কোনো জটিলতায় পড়বেন কি না, সেই শঙ্কা রয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকারদের মতে, এই ধরনের মানসিক ভয় একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে। এতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকের পরিবর্তে ঘরে টাকা রাখার দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গতি কমে যেতে পারে এবং নগদ নির্ভরতা আবার বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে, প্রয়োজনে এই বিধান বাদও দেওয়া হতে পারে।

