আমন ধান কাটা হয়ে গেছে‘ কিন্তু চালের দাম কমছে না। সরকার কী করছে? বাজার দেখার কেউ নেই?’—মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারে মাদারীপুর রাইস স্টোরে আসা তাজমহল রোডের বাসিন্দা মো. মামুন গতকাল এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করেছিলাম সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙবে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ের বালি। বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, ডাল, মাছসহ অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। অধিকাংশ সবজির দামও বাড়তি।’
নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক কারণে যতটা না বেড়েছে, বাজারের অব্যবস্থাপনার কারণে তা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কমলেও দেশের সিন্ডিকেটের জালে আটকে থাকায় ভোক্তারা সুফল পাচ্ছেন না।
দ্রব্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি বা হ্রাসকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর এক কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৭০ টাকা। বর্তমানে তা ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২১ শতাংশ। সাধারণ মানুষ দাম বাড়া বা কমাটা তাৎক্ষণিকভাবে টের পান। বাজারে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে হইচই পড়ে। যেমন, সিন্ডিকেট চক্র কয়েক দিনে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৬০ টাকায় ঠেকিয়ে দেয়। ভোক্তারা বাড়তি দামে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য। হইচই পড়ে সরকার বাধ্য হয়ে আমদানির অনুমতি দেয়। তারপরও দাম তেমন কমে না।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। সরকার দাম বাড়ানোর অনুমতি না দিলেও মিলমালিকরা লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকায় বিক্রি শুরু করেন। পরে বাণিজ্য উপদেষ্টা জানালেন, ‘সরকার জানে না, কীভাবে দাম বেড়ে গেল।’ শেষ পর্যন্ত ৬ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৯৫ টাকায় বিক্রি ঘোষিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদ হারের কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ছোট উদ্যোক্তারা চাপে পড়েছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি কমছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। ২০২১ সালের নভেম্বরের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫.৯৮ শতাংশ। ২০২২ সালের নভেম্বরের হার লাফ দিয়ে ৮.৮৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৩ সালের নভেম্বর হয়েছে ৯.৪৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে জুলাই-আগস্টে সরকার পরিবর্তনের কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বোরো ধান উঠলেও চালের দাম বাড়ে। অন্যান্য পণ্যের দামও লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতিও লাফিয়ে ১১.৩৮ শতাংশে পৌঁছায়। খাদ্য খাতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। তিনি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। নীতি সুদ তিন দফায় বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে যান। চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবে এটি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত খাতের দামও বেড়েছে। গ্রাম-শহর সব জায়গায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। তাই এটি এখনো সরকারের মাথা ব্যথার কারণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বেশি। বাজার ব্যবস্থাপনায় কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। সরকারের উদ্যোগে দাম কমলেও যথেষ্ট কমে না। প্রতিযোগিতা থাকলে সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াতে পারবে না।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি করে সরবরাহ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও আমাদের দেশে বোরো ও আমনের ফলন ভালো হলেও দাম বেড়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘এক প্রান্তিতে ভালো হলে অন্য প্রান্তিতে খারাপ। আমাদের অর্থনীতির এই বর্তমান অবস্থা থেকে আগামী ১-২ বছরে বেরোতে সময় লাগবে। সাপ্লাই চেইনে নজর দিতে হবে।’
সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। দারিদ্য বাড়ছে। বিভিন্ন উদ্যোগে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। পাঁচ শতাংশের ঘরে নামাতে সুদের হার বাড়ানোসহ মুদ্রানীতি বিবেচনা করতে হবে।’

