গত ২৩ বছরে বগুড়ায় ডেভেলপার কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে ৭৫টি। ২০০২ সালে উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় ‘ডলফিন টাওয়ার’ নামে ৯ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করেন ব্যবসায়ী মো. জুলফিকার আলী রকেট। ৬২ ফ্ল্যাটের এই ভবন ২০০৬ সালে শেষ হয় এবং সব ফ্ল্যাট বিক্রি হয় ২০০৮ সালের মধ্যেই।
মো. জুলফিকার আলী রকেট জানান, ‘তখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। তখন জলেশ্বরীতলায় ৪৩৫ বর্গফুটের জায়গার দাম ছিল ২ লাখ টাকা, এখন একই পরিমাণের দাম কমপক্ষে ৭০ লাখ টাকা। ওই এলাকায় ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের দাম এখন ৬ হাজার ৫০০ টাকার বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বগুড়ার মধ্যে ফ্ল্যাটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি জলেশ্বরীতলায়। এখানে বর্তমানে ৬২টি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। পৌর এলাকার মোট ১৬৫টি বহুতল ভবন রয়েছে।’
বগুড়া পৌরসভার নগর পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা মো. আল মেহেদী হাসান জানান, বগুড়ায় এখন পর্যন্ত ৭৬টি ডেভেলপার কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পৌর এলাকায় আটতলা ও তার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এই সময়ে অন্তত ২০০টি ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পৌর কর্তৃপক্ষ আটতলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল ২৪০টি।
নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আল মেহেদী হাসান বলেন, ‘বগুড়ায় গড়ে প্রতিবছর চারটি করে ডেভেলপার কোম্পানি অনুমোদন পাচ্ছে, আর আবেদন পড়ছে আরও বেশি।’ ফ্ল্যাট চাহিদা কেন বেশি, প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সামাজিক ও আর্থিক কারণে ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়ছে। জলেশ্বরীতলা শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায়, কোচিং সেন্টার, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ। বগুড়া এখন শিক্ষা নগরীতে পরিণত হয়েছে। নওগাঁ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ থেকে অনেকেই ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য এখানে পাঠাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পছন্দের জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই তারা ফ্ল্যাটে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এখন লোন সুবিধার কারণে ফ্ল্যাট কেনা সহজ হয়েছে।’
জলেশ্বরীতলায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে পাঁচ তারকা ‘হোটেল মম ইন’ সংলগ্ন কন্ডোমিনিয়াম প্রকল্পের। এটি বাস্তবায়ন করছে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন লিমিটেড (বিসিএল) প্রপার্টি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যেই ১২টি প্রকল্প শেষ করেছে। নতুন কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে।
কন্ডোমিনিয়াম প্রকল্পে চারটি বহুতল ভবন হবে, যেখানে মোট ১২৮টি ফ্ল্যাট থাকবে। ইতিমধ্যেই নির্মাণাধীন দুটি ভবনের ৬৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৫০টি বুকিং হয়ে গেছে। প্রতি বর্গফুটের দাম ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। প্রধান প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান জানান, ‘বিসিএল এর পূর্ব প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ হয়েছে। চলমান প্রকল্পগুলোও নির্ধারিত সময়মতো হস্তান্তর করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকার গুলশান-২, মিরপুর, বসুন্ধরা ও উত্তরায় নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে বিসিএল প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট। দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যেই অনেক অগ্রগতি দেখিয়েছে।’
রিয়েল এস্টেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মো. সাইরুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়ায় অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসার সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। বগুড়া-ঢাকা রেল যোগাযোগ শুরু ও বিমানবন্দর চালু হলে ব্যবসা আরও প্রসারিত হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত ২৮টি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছে। তবে আরও বহু প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।’
আধুনিক সুবিধাসহ ফ্ল্যাট কেনার প্রধান অংশগ্রাহক প্রবাসী ও চাকরিজীবী। তাদের অনেকের বাড়ি জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ও নওগাঁয়। স্থান ও পরিবেশের কারণে তারা জলেশ্বরীতলা ও হোটেল মম ইন সংলগ্ন কন্ডোমিনিয়াম প্রকল্পে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

