জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশের আশপাশে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি উচ্চ এক অংকে স্থায়ী হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দা ও মূল্যস্ফীতির যুগপৎ সংকট হিসেবে দেখছেন। এতে সাধারণ মানুষের আয় সংকুচিত হচ্ছে। কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা এই সতর্কবার্তা দেন। তারা বলেন, মন্দা না থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, দুর্বল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ঘাটতি একসঙ্গে বাংলাদেশকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক চক্রে ফেলেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)’ যৌথভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ টিটো, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ আরও অনেকে।
অর্থনীতিবিদরা ব্যাখ্যা করেন, স্ট্যাগফ্লেশনের সময় উচ্চ বেকারত্বের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি থাকে। এটি সাধারণ মন্দার চেয়ে ভিন্ন। কারণ মন্দার সময় সাধারণত চাহিদা কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পায়। কিন্তু স্ট্যাগফ্লেশনে সেই নিয়ম কাজ করে না।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত স্ট্যাগফ্লেশন সাধারণত উন্নত অর্থনীতিতে দেখা যায়। উন্নয়নশীল দেশে এটি তুলনামূলক বিরল। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত তিন থেকে চার বছর ধরে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে রয়ে গেছে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশে স্ট্যাগফ্লেশনের প্রবণতা স্পষ্ট।
সিপিডির ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, কাঠামোগত সংস্কার, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশ ‘নিম্নমাত্রার প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির’ অর্থনীতিতে আটকে পড়তে পারে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অথচ মজুরি বৃদ্ধির হার এর সঙ্গে তাল মিলছে না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে থাকলেও মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ এক অংকে রয়ে গেছে। এর পেছনে বিনিময় হার অবমূল্যায়ন ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বড় ভূমিকা রাখছে। ফাহমিদা খাতুন যোগ করেন, গত তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। প্রথমে কোভিড মহামারিতে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত ঘটে। পরে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অর্থনীতিবিদ মনজুর সাঈদ বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। শুধু সংখ্যাগত লক্ষ্য নয়, অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।
রাষ্ট্র অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বর্তমানে দেশের জিডিপির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৫ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে হলে ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু স্থিতিশীলতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ভারসাম্য এবং আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার—এই তিনটি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্যপণ্যের দামে চাঁদাবাজি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্যে সিন্ডিকেটের প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। চাঁদাবাজি ও বাজার কারসাজি একে অপরকে শক্তিশালী করছে।
রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভেরিয়েবল সম্পর্কে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ফলাফল শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। তবে গতি হারালে উন্নয়নের ফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ ধীরগতির হওয়ায় প্রবৃদ্ধি সীমিত হয়ে পড়ছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ ছিল জিডিপির প্রায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নামার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হার হওয়া উচিত প্রায় ৩০ শতাংশ।
তবে জাহিদ হোসেন বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে বৈদেশিক ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে ‘সফট পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা বাজারে অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হয়েছে।
আর্থিক খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, একীভূকরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও আর্থিক খাত এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। সুদের হার বেশি থাকায় পূর্ণ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি খারাপ হওয়া থামলেও গভীর সংস্কার ছাড়া টেকসই সমাধান আসবে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে করনীতি সংস্কার ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বিরোধিতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রেই সংস্কারের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ দেখা যায়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের এপ্রিল-জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা ছিল। রাজনৈতিক, প্রাকৃতিক বা বাহ্যিক—যে কোনো অস্থিরতারই নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তুলে ধরেন তিনি। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৭ লাখ। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী। তিনি বলেন, এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। বৈষম্য কমাতে মানসম্মত ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে তীব্র অসামঞ্জস্য এর অন্যতম কারণ।
সংস্কার প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তবে সেটি একা যথেষ্ট নয়। সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। জাহিদ হোসেন বলেন, সংস্কারে সবসময় বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষ থাকে। যারা বর্তমান ব্যবস্থায় লাভবান, তারা সংস্কারের বিরোধিতা করে। তাই সংস্কারের দায়িত্ব ও মালিকানা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

