দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের অনিয়ম ও অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, তা আজ এক দশক ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অধীনে থাকা এই ট্রাইব্যুনালে গত ১০ বছরে একটি নতুন মামলাও আসেনি। শুধুমাত্র ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বাজার ধস-সংক্রান্ত ২৭টি পুরোনো মামলাই এর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করছে।
বাস্তবে রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল ভবন এখন আর বিচারকক্ষ নয়। বরং এটি ভাঙাচোরা আসবাবের গুদামঘরে পরিণত হয়েছে। মূলত জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই এগোচ্ছে বিএসইসি। তবে এই কাঠামোয় প্রকৃত শাস্তি আর দায় নির্ধারণের কার্যকর পথ প্রায় বন্ধই। তদন্তে অপরাধ শনাক্ত হলেও মামলা করা হয় না। আর যেসব মামলা করা হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ বছরের পর বছর উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। এর ফল স্পষ্ট—ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বিচার কার্যত অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন, আদালত ও কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে দায়বদ্ধতা চিহ্নিত হবে না এবং শাস্তি না হওয়ায় বাজারে দায়হীনতা ও শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি আরও বৃদ্ধি পাবে। ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে বড় কেলেঙ্কারির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকের নেতৃত্বে এই স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবে সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২৭ মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০টি নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৪টি মামলা উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে, ৩টি স্থগিত। ২০১৫ সালের পর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা চারটি মামলাও এখনও স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিএসসির বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একজন জেলা ও দায়রা জজসহ ছয়জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ে চললেও এজলাসে কোনো বিচারিক কার্যক্রম নেই। আসামিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষসহ পুরো আদালত এখন ধুলোবালু ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত। বিনিয়োগকারীর বড় অংশও জানেন না এমন একটি ট্রাইব্যুনাল আছে কি না। গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের মধ্যেও এর কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই।
বিনিয়োগকারী সানী মাহমুদ বলেন, ‘বিএসইসির যে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আছে, সেটা আমি জানি না। কাজকর্মও জানা নেই।’
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, ‘এর সর্বশেষ অবস্থা কী, আমরা জানি না। কার্যক্রম আছে কি না, তা অনিশ্চিত।’
বিএসইসি জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অনিয়ম দমন করছে। সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরেই সাড়ে তিনশোর বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেড় বছরে জরিমানার পরিমাণ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে। তবে জরিমানার বড় অংশ আদায় হচ্ছে না। জরিমানা আরোপের পর মামলার সুযোগও নেই।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘মামলা ট্রান্সফার করে আনলেও সেগুলো আবার উচ্চ আদালতে চলে যাচ্ছে। দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতি চিহ্নিত করে জরিমানা করাই কি যথেষ্ট নয়?’
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, শুধু জরিমানা দিয়ে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় থাকলে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পেত এবং অন্যরা অপরাধে নিরুৎসাহিত হতো।’
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকা জরিমানা করলেও লাভ নেই। আদায় হচ্ছে না, বরং বাজারে অস্বস্তি বাড়ছে।’

