সংকট কাটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, এলপিজির পুরো বাজার বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীল। ফলে সংকটে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান ১০ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি পাঠান। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ–ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধি হয়েছে। নির্ধারিত দামে কোথাও কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থিতিশীল করার সরকারি কোনো হাতিয়ার নেই। চিঠিতে বলা হয়েছে, নীতিগত অনুমোদন পেলে বিপিসি জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে দ্রুত বাজারে সরবরাহ করবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আমিন উল আহসান বলেন, “এলপিজির বাজার কার্যত বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। সরকারিভাবে কিছু আমদানির মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য আসবে। তাই আমরা অনুমতি চেয়েছি।” তিনি আরও জানান, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা জটিলতার কারণে এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। বিপিসি আমদানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করতে চায়, এতে সংকট দূর হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি খাতকে সরবরাহ করলে একই পরিস্থিতি থাকবে। এলপিজির দাম প্রতি মাসে বিইআরসি নির্ধারণ করে, কিন্তু বাজারে সেই দামে বিক্রি হয় না। তাই আমদানি করে বিপিসি সরাসরি ভোক্তার কাছে না পৌঁছালে বাজারে তেমন প্রভাব পড়বে না। আগেও সরকার এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “দেশে সরকারিভাবে এখনো এলপিজি আমদানি হয়নি। তবে আমরা সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। আমদানির মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য আসবে। সংকট কমবে। ভবিষ্যতে গ্রাহকরা জিম্মি হবেন না। আপাতত সরকার কেবল আমদানি করবে, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ বা বিতরণে জড়িত হবে না।”
বিপিসির চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের এলপিজি আমদানির জন্য প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পর্যায়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। তবে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র থেকে বড় জাহাজে এলপিজি আনিয়ে লাইটার জাহাজে খালাস করে নিজের টার্মিনালে সংরক্ষণ ও বিতরণ করে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে বেসরকারি অপারেটরের সুবিধা ব্যবহার করে এলপিজি খালাস ও বণ্টন করতে পারে।
চিঠিতে প্রস্তাব রয়েছে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, আমদানির পরিমাণ, মূল্য পরিশোধ, খালাস ও বণ্টন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
লোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “বিভিন্ন কারণে এলপিজি বাজারে সংকট চলছে। বিপিসি যদি আমদানি করে পরিস্থিতি ঠিক করতে পারে, ভোক্তারা উপকৃত হবেন।”
দেশে এলপিজি বাজারে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধারা আছে। সরকারি পর্যায়ে সীমিত সরবরাহ করে বিপিসির তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার টন। বাকি চাহিদা পূরণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। লোয়াব ও বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে ২৩টি কোম্পানির আমদানি সক্ষমতা রয়েছে, তবে মূলত পাঁচ–ছয়টি কোম্পানি বড় পরিসরে আমদানি করে। গত বছর আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৮.৫ লাখ টন।
বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের ঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা, তবে বাজারে তা মেলে না। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংকট ও সরবরাহ চাপে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত এলপিজি গ্যাস ও বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। এর ৮০ শতাংশ রান্নায়, বাকি ২০ শতাংশ শিল্প ও যানবাহনে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবছর চাহিদা বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপিজি গ্যাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে চাহিদা বছরে ৩০ লাখ টন ছাড়াতে পারে। সরকারি উৎস থেকে সর্বাধিক জোগান হতে পারে ৫০ হাজার টন, যা চাহিদার তুলনায় খুব কম।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “বিগত সরকারগুলো এলপিজি খাত পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে ফেলেছে। ভোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত জরুরি। প্রয়োজনে সরকারিভাবে আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়াতে হবে।”

