গত অর্থবছরে প্রায় ৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পর ২৯টি সরকারি প্রকল্প অসমাপ্ত রেখেই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে থাকা এই প্রকল্পগুলোর জন্য মোট ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল।
গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাতিল হওয়া উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে:
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ অবলোকন কেন্দ্র
- খুলনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার
- বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্প
- কুড়িগ্রামের জামালপুর–ধানুয়া–কামালপুর–রৌমারী–দাতভাঙ্গা জেলা সড়ক (জেড–৪৬০৬) সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ
- ফরিদপুর–গোপালগঞ্জ ও সরাইল–আলফাডাঙ্গা–কাশিয়ানী সড়ক উন্নয়ন
- ফেনীর দাগনভূঞায় ভাষাসৈনিক শহীদ সালাম স্মৃতি প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র ও কমিউনিটি হাসপাতাল
- মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত)
- যশোরে শেখ জহুরুল হক পল্লী উন্নয়ন একাডেমি
- ছয়টি বিভাগীয় শহরে টেলিভিশন স্টেশন নির্মাণ
সোমবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। আইএমইডি ও পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি বঙ্গবন্ধু মহাকাশ অবলোকন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কর্কট ক্রান্তিরেখা ও ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার সংযোগস্থলে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং বিজ্ঞানচর্চা প্রসারের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে ২১৩ কোটি টাকায় একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্প ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও অনুমোদন অত্যন্ত দ্রুত হওয়ায় ত্রুটি ও বিচ্যুতি ছিল। সমীক্ষা দুর্বল এবং বর্তমান নকশা বাস্তবায়ন করলে কোনো সুফল পাওয়া যেত না। প্রকল্প কার্যকর করতে হলে আরও কয়েক গুণ ব্যয় প্রয়োজন। এসব কারণেই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইএমইডি জানায়, বাতিল হওয়া আরেকটি বড় প্রকল্প হলো পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়ায় নদী বন্দর আধুনিকায়ন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রকল্পটি ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রায় ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
প্রধান বাধা ছিল ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা। ডিপিপিতে ধরা অর্থ চূড়ান্ত প্রাক্কলনের চেয়ে কম ছিল, ফলে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করা যায়নি। প্রধান নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়ে। এছাড়া নদীর তীররক্ষা কাজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। নদীর মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন, ব্যাংক লাইনের স্থানান্তর এবং নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে খরচ ৬৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ১০৬ কোটি টাকা হয়। অনুমোদিত ডিপিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কারিগরি দিক থেকেও প্রকল্পটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বুয়েট জানায়, দৌলতদিয়া প্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, তাই পূর্বের ডেটা দিয়ে তীররক্ষা নকশা চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়। নতুন ডেটা সংগ্রহ ও পুনর্নকশায় অন্তত দুই বছর সময় লাগবে, যা প্রকল্পের মেয়াদে মেলে না। এসব কারণে প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।
আইএমইডি সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ঢাকার বাইরে ছয়টি বিভাগীয় শহরে ছয়টি টেলিভিশন স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। চীন থেকে ৯৮৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও বর্তমান সরকার প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকারহীন হিসেবে বাতিল করেছে।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “এ ধরনের প্রকল্প বাতিলের ঘটনা নতুন নয়। পরিকল্পনার দুর্বলতা, আংশিক কাজ ও ব্যয় বৃদ্ধির পর প্রকল্প বন্ধ করা হয়। এটি শুধু প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক দুর্বলতার প্রতিফলন।” তিনি বলেন, “নদীর মরফোলজি, ভূমি অধিগ্রহণের খরচ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা—এসব ফিজিবিলিটি স্টাডিতে আগে থেকেই বোঝা সম্ভব ছিল। অথচ প্রকল্প অনুমোদনের পরই সমস্যা সামনে আসে। ফিজিবিলিটি স্টাডি কি বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকে। সঠিক বিশেষজ্ঞ বা মানুষকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তাও গুরুত্বপূর্ণ।”
সাবেক পরিকল্পনা সচিব এমডি মামুন-আল-রশিদ বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রকল্প বাতিলের আগে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। রাষ্ট্র ইতিমধ্যে বিশাল অর্থ হারিয়েছে। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে মিল না থাকাই মূল সমস্যা।”
তিনি আরও বলেন, “এই চক্র বন্ধ করতে হবে। স্বাধীন ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা যাবে না। বাস্তবায়নের সঙ্গে মিল না থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় চলতেই থাকবে।”

