নতুন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাড়াল গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা। রাজধানীর ফ্ল্যাটের দাম ও নির্মাণ খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংক এখন ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। আগে সর্বোচ্চ সীমা ছিল ২ কোটি টাকা।
এই সিদ্ধান্তে আবাসন খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের কম, শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রে ঋণের সীমা বাড়বে। খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের কম থাকলে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা, আর ৫ থেকে ১০ শতাংশ থাকলে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে।
বর্তমানে ৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে। সুতরাং এই ব্যাংকগুলো নতুন নীতির অধীনে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। একক গ্রাহককে সর্বোচ্চ কত ঋণ দেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ওপর। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে আবাসন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। আগে সব ব্যাংকের জন্য একই সীমা ছিল। এখন থেকে খেলাপি ঋণ কম ব্যাংক বেশি ঋণ দিতে পারবে। ঋণদানের ক্ষমতা বাড়লেও ব্যাংককে অবশ্যই ঋণ ও নিজস্ব পুঁজির অনুপাত ৭০:৩০ বজায় রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্ল্যাটের দাম ১০০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ব্যাংক অর্থায়ন করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যানুযায়ী, ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের কম। এর মধ্যে ৬টির খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে। সেগুলো হলো সিটিজেন্স ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। তারা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।
অন্যদিকে, ৫ থেকে ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ১১টি ব্যাংক আছে। সেগুলো হলো মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী, এনসিসি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে। অন্য সব ব্যাংক আগের মতো সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ফ্ল্যাটের দাম ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা হয়, তাহলে ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া যাবে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবাসন খাতকে গতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধিত প্রজ্ঞাপন ইতিমধ্যে জারি হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক আবাসন ঋণের সীমা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। আমরা নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ জানাই।’
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ঋণসীমা বাড়ায় নতুন বাড়ি, ফ্ল্যাট বা প্রকল্প কিনতে চাইলে ভোক্তারা বেশি ঋণ পাবেন। এতে আবাসন খাতের চাহিদা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গৃহঋণের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। এতে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীরা সহজে ঋণ নিতে পারবে। বিশ্বের অনেক দেশে গৃহঋণ সহজ শর্তে ও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে দেওয়া হয়। মার্কিন ব্যাংকিং খাতে গৃহঋণের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহঋণ বাড়লে শুধু আবাসন খাত নয়, কমপক্ষে ৫০০টি খাত সরাসরি বিকশিত হয়। যেমন রড, সিমেন্ট, বালু, কাঠ, আসবাব ও রঙসহ নানা শিল্প খাত। এছাড়া গৃহঋণ ঝুঁকিমুক্ত। ঋণগ্রহীতারা সাধারণত খেলাপি হন না। খেলাপি হলেও ব্যাংক সহজে টাকা পুনরুদ্ধার করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাহসী সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

