চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন মাত্র ১৮ শতাংশেরও কম। অতিমারি করোনাকালেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এত মন্থর গতি দেখা যায়নি।
করোনার প্রভাব কমাতে সব ধরনের ব্যয়ে সাশ্রয়ী নীতি নেওয়া হয়। ফলে গত প্রায় চার বছর ধরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ধীর হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) এডিপির মোট ব্যয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ হাজার ২২৪ কোটি টাকা কম।
গতকাল বুধবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসের এডিপি বাস্তবায়ন গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। একক মাস হিসেবে ডিসেম্বরে ব্যয়ের হার সামান্য বেড়েছে। মাসটিতে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৫.৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৫.৬৭ শতাংশ।
তবে চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার আগের বছরের তুলনায় ছোট হওয়ায় ব্যয় কম হলেও শতাংশ হিসেবে বাস্তবায়ন বেশি দেখাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের ডিসেম্বরে ব্যয় হয়েছিল ১৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।
এডিপি ব্যয়ে মন্থরতার কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। গত সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের পর এক ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকারের সংস্কারের মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুমোদন। এর আওতায় সব টেন্ডার শতভাগ ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ইজিপি) করা হয়েছে। এই কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা ধীর।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের শর্তে ছয় মাসের মাথায় বাস্তবায়নের গুণমান বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এই নিয়মও বাস্তবায়ন ধীর করার একটি কারণ। এছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক চলে গেছেন। নতুন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে সময় লেগেছে।
সরকার বর্তমানে কিছু বড় প্রকল্প পর্যালোচনা করছে। এর ফলে বরাদ্দের চাহিদা কমেছে। এছাড়া এই অর্থবছর নির্বাচনের বছর হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তুলনামূলক কম বরাদ্দের দাবি করেছে। এসব কারণে এডিপি বাস্তবায়ন অনেক কম হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের এই হতচিত্রের কারণে এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। আর এডিপির আকার দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১,১৯৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের সংখ্যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। এই বিভাগের বাস্তবায়ন হার মাত্র ২ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, যা ৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাত এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে রুগ্ণ দশায় রয়েছে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন রেলপথ মন্ত্রণালয়, যার বাস্তবায়ন ১০ শতাংশের কম। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১২ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ১৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে।
বিপরীতে, সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় এডিপি বরাদ্দের ৩৬ শতাংশ ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, যা ৩১ শতাংশের কিছু বেশি। তৃতীয় অবস্থানে স্থান পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ৩১ শতাংশের কিছু কম ব্যয়ে। শীর্ষ পাঁচে রয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তাদের বাস্তবায়ন হার যথাক্রমে ২৮ ও ২৩ শতাংশ।

