গত অর্থবছর (২০২৪-২৫) দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৯১৩ কোটি ডলার বা ৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এর প্রভাবে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫৫ ডলার। নতুন ঋণ যুক্ত হওয়ার পর জুন শেষে বৈদেশিক ঋণের মোট স্থিতি হয়েছে ১১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। হিসাবের মধ্যে সরকারি ঋণ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মাথাপিছু ঋণের বৃদ্ধি কভিড পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু ঋণ ছিল ৬০৯ দশমিক ৭০ ডলার। ২০২২-২৩ শেষে কমে ৬০৭ দশমিক ২২ ডলার এবং ২০২৩-২৪ শেষে কমে ৬০৬ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে ঋণ এক লাফে বেড়ে ৬৫৪ দশমিক ৯০ ডলার হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরলে এটি ৭৯ হাজার ৮৯৮ টাকার সমান।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিদেশী ঋণ নেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এ ঋণ বেড়ে ১০৪ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। অনেক ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে গেছে। বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং সুদ ও সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য বিদেশী ঋণ নিতে হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনে ঋণের চাপ আরও বাড়বে এবং যে কোনো নতুন সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্পের নামে নেওয়া ঋণের বড় অংশ দেশ থেকে চলে গেছে। প্রকল্প ব্যয় দুই-তিন গুণ বেশি দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এখন গ্রেস পিরিয়ড শেষ, তাই ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হতে পারে।’ তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে তিনি ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে। ঋণ বেড়ে মাথাপিছু ঋণও বেড়েছে। কিন্তু এখন বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেই। তাহলে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। রাজস্ব আদায় সন্তোষজনক নয়। দেশের ব্যাংক খাত থেকেও ঋণ বেড়াচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে পরিচালন ব্যয় আরও ৭০–৮০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। যদি এসবও বিদেশী ঋণ থেকে মেটাতে হয়, তাহলে অর্থনীতিতে সমস্যা হবে।’
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের জুনে বিদেশী ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৮০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঋণের প্রবাহ কিছুটা কমলেও পরবর্তী সময়ে বেড়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ৮৫ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জুনে এটি ৯৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এর মধ্যে ৮০ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার সরাসরি সরকার নিল, বাকিটা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েছে। একই সময়ে বিদেশী ঋণ পরিশোধও বেড়েছে। ২০০৯-১০ সালে বিদেশী ঋণ পরিশোধ ছিল ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরে বেড়ে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
বেসরকারি খাতও বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ জুনে বেসরকারি ঋণ ছিল ১৯ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে মোট ঋণ ১১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরলে এটি ১৩ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ‘গত অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ পেয়েছি। অতীতে হিসাবায়নের কিছু ত্রুটি সংশোধন করাও ঋণ বাড়ার কারণ। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন ঋণগ্রহণের পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির দায়ও পরিশোধ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের কিছু বকেয়া ছাড়া এখন আর কোনো বিদেশী ঋণ বকেয়া নেই।’
অর্থ পাচার ও দুর্নীতির প্রভাব ২০২০ সালের পর থেকে দেশের অর্থনীতিকে নাজুক করেছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে ডলার সংকট তীব্র হয়। দুই বছরের মধ্যে টাকার মান ডলারের বিপরীতে ৪০ শতাংশ কমে যায়। সমস্যার সমাধানে তৎকালীন সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋণ ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
আইএমএফ গত বছরের জুনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণের শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিকে ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার এবং প্রথমার্ধে ৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার নেওয়া যাবে। আইএমএফ ঋণগ্রহণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকি নিম্ন থেকে মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রফতানি তথ্য সংশোধনের কারণে ঝুঁকি বেড়েছে। জিডিপির তুলনায় কম রাজস্ব আয় ও স্থানীয় ঋণ কাঠামোর কারণে দায় পরিশোধে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে অতীতের সরকারগুলোর মানদণ্ড অনুসরণ হয়নি। লাভজনক প্রকল্প ছাড়া ঋণ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে ঋণের বিকল্প খুঁজতে হবে। শুধু লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া উচিত। অন্য প্রকল্পের আয়ের মাধ্যমে ব্যয় মেটাতে হবে।’
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, ২৬.৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৮.১৩ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার। ১৫ জানুয়ারি রিজার্ভ ছিল ২৮.০৩ বিলিয়ন ডলার।

