সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন দপ্তরগুলোকে ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অর্থ বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। নতুন আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ও পুনঃঅর্পণ-সংক্রান্ত অফিস স্মারকের সঙ্গে সংযুক্ত তালিকায় এসব বিষয় নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আর্থিক ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। ১৯ জানুয়ারি অর্থ সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার আদেশে সই করেছেন। এতে পরিচালন ও উন্নয়ন—উভয় বাজেটের আওতায় আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ও পুনঃঅর্পণের হালনাগাদ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। আদেশটি জারি হওয়া সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, পদ সৃষ্টি ও বিলুপ্তকরণ, তিন বছরের বেশি সময়ের অস্থায়ী পদ সংরক্ষণ, পদবী, মর্যাদা ও বেতনক্রম পরিবর্তন এবং পদ স্থায়ীকরণের সব প্রস্তাব অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হবে। মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে সংযুক্ত অধিদপ্তর, অফিস ও সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামোয় যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্তি বা সংশোধন এবং যানবাহন ক্রয় ও প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ওয়ার্কচার্জড ও কন্টিনজেন্ট কর্মচারী নিয়োগ, আউটসোর্সিং নীতিমালার আওতায় সেবা ক্রয় এবং দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের প্রস্তাবও অর্থ বিভাগের বিবেচনার জন্য পাঠাতে হবে। এতে জনবল ব্যবস্থাপনা ও সেবা গ্রহণে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।
বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয়, অনুমোদিত বরাদ্দের বাইরে খরচ এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত বা দায়মুক্ত মঞ্জুরি ও পুনঃউপযোজনেও অর্থ বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজস্ব ব্যয় থেকে মূলধনে বা মূলধন ব্যয় থেকে রাজস্বে পুনঃউপযোজন এবং বিএসসি অনুযায়ী বেতন-ভাতা খাত থেকে অন্য অর্থনৈতিক শ্রেণিতে অর্থ স্থানান্তরে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাইরে কোনো আর্থিক অঙ্গীকার এবং প্রাক-স্বাধীনতাকালের আর্থিক দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। এতে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক দায় সৃষ্টি হবে কিনা, তা আগে যাচাই করা যাবে।
কঠোর শ্রমসাধ্য বা বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ১৫ হাজার টাকার বেশি সম্মানী দেওয়া বা একই অর্থবছরে একাধিকবার সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রেও অনুমোদন লাগবে। বেতন-ভাতা, ভ্রমণ ও বদলি ব্যয়, ভবিষ্যৎ তহবিল, পেনশন ও আনুষঙ্গিক বিধি-নিষেধের ব্যাখ্যা এবং বেতনভাতা-সংক্রান্ত চাকরির শর্ত পরিবর্তনের বিষয়গুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নিষ্পত্তি করা হবে।
নন-এনবিআর কর, এনটিআর, ফি আরোপসহ সরকারি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে এমন সব প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। বাজেট বরাদ্দের বাইরে অনুদান দেওয়া বা বিধিবহির্ভূত আগাম বর্ধিত বেতন প্রদানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। জালিয়াতি বা গাফিলতির কারণে পাঁচ লাখ টাকার বেশি অনাদেয় ক্ষতি অবলোপন এবং সরকারি কর্মচারীকে দেওয়া অনাদেয় ঋণ বা সুদ অবলোপনের ক্ষেত্রেও অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বিদেশ সফরে কেবিনেট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের নির্ধারিত ডলারের সীমা অতিক্রম করলেও অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
নতুন অফিস স্মারকে বলা হয়েছে, কোনো ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা যাবে না। সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয়ের সময় যে হিসাব করেন, ঠিক সেই মনোভাব সরকারি অর্থ ব্যয়ে অবলম্বন করেন। অর্থ বিভাগের মতে, এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, ২০১৫ সালের আর্থিক ক্ষমতা আদেশের পর প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট শ্রেণিবিন্যাস এবং সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় বড় পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন সংশোধন এবং ২০২৫ সালের নতুন বিধিমালা প্রণয়নের পর আর্থিক ক্ষমতা হালনাগাদ জরুরি হয়ে পড়েছিল। এজন্য ২০১৫ সালের আদেশ বাতিল করে নতুন সমন্বিত অফিস স্মারক জারি করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, নির্দিষ্ট তালিকার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট হওয়ায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আরও জোরদার হবে।

