নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন গ্রেড অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পেনশন, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও প্রায় একই হারে বাড়বে। বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এসেছে। পরিবহন ভাতাও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদন জমা:
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সদস্যরা।
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদনের প্রাপ্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও ব্যয়:
কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকার ব্যয় করছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য বর্তমান বেতন কাঠামো যথাযথ নয়।
প্রেস উইং জানায়, কমিশন অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করেছে। ২,৫৫২ জনের মতামত নেয়া হয়েছে। সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা সভা করে ব্যাপক মতবিনিময় হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সংস্থান ও বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সরকার ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশনের পর ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো:
২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। ভাতা মিলিয়ে মোট বেতন-ভাতা ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন স্কেলে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা, ভাতা মিলিয়ে মোট বেতন-ভাতা হবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা। অন্যান্য গ্রেডেও ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সমতা বজায় রাখতে কিছু ভাতা বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেলের অনুপাত ১:৮। প্রথম বেতন কমিশনে (১৯৭৩) অনুপাত ১:১৫.৪, ২০১৫ সালে ১:৯.৪ ছিল। এবার সবচেয়ে কম অনুপাত সুপারিশ করা হয়েছে।
বেতন ধাপ অনুযায়ী সুপারিশ:
-
২য় ধাপ: ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার
-
৩য় ধাপ: ৫৫,৫০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার
-
৪র্থ ধাপ: ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ
-
৫ম ধাপ: ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার
-
৬ষ্ঠ ধাপ: ৩৫,৫০০ থেকে ৭১ হাজার
-
৭ম ধাপ: ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার
-
৮ম ধাপ: ২৩,০০০ থেকে ৪৭,২০০
-
৯ম ধাপ: ২২,০০০ থেকে ৪৫,১০০
-
১০ম ধাপ: ১৬,০০০ থেকে ৩২,০০০
-
১১ম ধাপ: ১২,৫০০ থেকে ২৫,০০০
-
১২ম ধাপ: ১১,৩০০ থেকে ২৪,৩০০
-
১৩ম ধাপ: ১১,০০০ থেকে ২৪,০০০
-
১৪ম ধাপ: ১০,২০০ থেকে ২৩,৫০০
-
১৫ম ধাপ: ৯,৭০০ থেকে ২২,৮০০
-
১৬ম ধাপ: ৯,৩০০ থেকে ২১,৯০০
-
১৭ম ধাপ: ৯,০০০ থেকে ২১,১০০
-
১৮ম ধাপ: ৮,৮০০ থেকে ২১,০০০
-
১৯ম ধাপ: ৮,৫০০ থেকে ২০,৫০০
পেনশন ও চিকিৎসা ভাতা:
-
মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন প্রাপ্তদের জন্য প্রায় ১০০% বৃদ্ধি
-
২০–৪০ হাজার টাকার জন্য ৭৫%
-
৪০ হাজারের বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫%
-
৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার
-
৫৫ বছরের কমের জন্য ৫ হাজার, মধ্যবয়সীদের জন্য ৮ হাজার
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর নতুন বেতন কাঠামো এখনই কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট কমিটি যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বাস্তবায়নই পরবর্তী কাজ।

