দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট, শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপের মধ্যে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। দূরবর্তী দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এবার প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশে গ্যাস পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় অনেক দ্রুত এবং ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদন পাওয়ার পর মিয়ানমারের সঙ্গে গ্যাস আমদানির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেখানে স্বল্পমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে। এসব দেশ থেকে জাহাজে গ্যাস আসতে ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে একই জ্বালানি আনতে সাধারণত ৬ থেকে ৭ দিন সময় লাগে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে সরবরাহ শুরু হলে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্যাস দেশে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিবদ্ধ গ্যাস সরবরাহ স্থগিত করে। এর ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, মূল্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলে মিয়ানমার থেকে দ্রুত গ্যাস আমদানি সম্ভব হবে। তার মতে, প্রতিবেশী হওয়ায় পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি জরুরি পরিস্থিতিতেও দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার প্রাকৃতিক গ্যাসসমৃদ্ধ একটি দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে রপ্তানির সক্ষমতাও রয়েছে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশের এই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহই সবচেয়ে সহজ এবং বাস্তবসম্মত উপায়। বিষয়টি যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের জ্বালানিমন্ত্রীকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু নতুন একটি জ্বালানি উৎসই পাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ওপর নির্ভরশীলতাও অনেকটা কমাতে পারবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জ্বালানি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে দেশের গ্যাস সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট দেশে মোট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২,১৩৯ মিলিয়ন ঘনফুটে, যার মধ্যে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিমাণ ছিল ৪৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট। দুর্ঘটনার আগে মোট সরবরাহ ছিল ২,৬৪২ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ২১ জুলাই দেশের দুটি ভাসমান গ্যাস গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর কেন্দ্রের একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে শুধু গ্যাস সরবরাহই কমে যায়নি, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানাকে সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনও এই সংকটের বড় শিকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আগে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেখানে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতেই নয়, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত মূল্য সমঝোতা, অবকাঠামো প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী জ্বালানি কৌশলই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।

