দেশের বেসরকারি খাত বর্তমানে এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এই বাস্তবতায় নিয়মিত কার্যক্রম চালানোই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দ্বিগুণের বেশি হারে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি বড় অংশ নতুন চাপের মুখে পড়বে।
বর্তমানে সরকারের নিজস্ব আয়ের বড় অংশ পরিচালনায় ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে, উন্নয়ন কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণনির্ভর অর্থায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রস্তাবিত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়লে অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়। চলতি বাজেটে এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে নতুন ব্যয় নির্বাহে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ঋণ করে নিয়মিত বেতন-ভাতা ও পেনশনের মতো ব্যয় মেটানো যুক্তিসংগত হবে না। এতে রাজস্ব ও ঋণের চাপ আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিতে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়াতে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাট বা অন্য পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত কর বহন করতে পারবে না।
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাত সেই চাপ নিতে সক্ষম নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫ ও ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন। এছাড়া সহজ শর্তে গাড়ি ঋণসহ বিভিন্ন ভাতা পাওয়া যাচ্ছে। তাই দ্বিগুণ বেতন দেওয়ার প্রস্তাব বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে যুক্তিসংগত নয়।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অতীতে ঘুষ-দুর্নীতি কমানো ও সরকারি কাজে গতি আনার যুক্তিতে বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। তবে বাস্তবে সমস্যার সমাধান হয়নি। বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় পুরো অংশ পরিচালন ব্যয়ে ব্যয় হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য যদি অযৌক্তিকভাবে শুল্ক-কর বাড়ানো হয়, ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ কার্যকর হলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি করা কঠিন। তবুও সরকারি বেতন বাড়ালে বাজারে প্রভাব পড়বে এবং সমাজে বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা বাড়বে।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমানো বা সাময়িক বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। নতুন বিনিয়োগেও আগ্রহ কমছে, ফলে শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকট আরও গভীর করছে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত এখন স্পষ্ট চাপের মুখে রয়েছে।

